স্বাধীনতা সংগ্রামে মহিলা নেতৃত্ব
জমিদার প্যারীসুন্দরীর নীলকর বিরোধী লড়াই

মীর মোশারেফ হোসেনের নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের পটভূমিকায় লেখা ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় উঠে এসেছে এক প্রতিবাদী নারী জমিদারের জীবন কাহিনী।

মোশারফের জন্ম অবিভক্ত নদীয়া জেলায়। নীলচাষ, নীলকর, নীল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার পরিণাম এসব কিছুই কাছ থেকে দেখেছেন। পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নীলকর টি আই কেনিকেও দেখেছেন। নীল স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগঠক ও নেতা সা গোলাম ছিলেন ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি, অবশ্য তার সঙ্গে আদৌ সদ্ভাব ছিল না মীর মোশারফের পরিবারের। কেনি মোশাররফকে বিলেতে পাঠিয়ে পড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মাতামহীর আপত্তিতে নাকচ হয়ে যায়।

এসব কারণে নীলকরের প্রতি তার কিছুটা যে অনুরাগ না জন্মেছিল তা নয়। পাশাপাশি আবার নির্যাতিত নীলচাষিও তার সহানভূতি লাভে বঞ্চিত হয়নি। এই দোলাচল মনোভাব নিয়েই মোশাররফ ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় (১৮৯০) কুষ্টিয়া অঞ্চলের নীলচাষ ও নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের কাহিনী বিবৃত করেছেন। ‘আমার জীবনী’ (১৯০৮-১০)-তেও প্রসঙ্গত নীলকরের কথা এসেছে। মোশাররফ সম্পাদিত ‘হিতকরী’ (১৮৯০) পত্রিকাতেও এ বিষয়ের কিছু খবর পাওয়া যায়। নীল সংক্রান্ত ঘটনা তার শ্রুতি ও স্মৃতিতে উজ্জ্বল ছিল। মোশাররফের নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের একটি প্রামাণ্য ইতিহাস রচনার ইচ্ছা থাকলেও বয়সের কারণে তার পক্ষে সেই কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই তিনি তার অনুজপ্রতিম সাহিত্য-সতীর্থ জলধর সেনকে বলেছিলেন : “তোমাকে নীলস্বাধীণতা সংগ্রাম সম্বন্ধে অনেক ‘নোট’ দিয়া যাইব, তুমি একখানি ইতিহাস লিখিও” (জলধর সেন : ‘কাঙাল হরিনাথ’, প্রথম খণ্ড , কলকাতা, ১৩২০; পৃ। ৩৯)। কিন্তু জলধরের আলস্যে সে আর হয়ে ওঠেনি।

‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’র কাহিনী দুটি ধারায় বিভক্ত। এর একদিকে রয়েছে নীলকর টিআই কেনির সঙ্গে সুন্দরপুরের (সদরপুর) মহিলা জমিদার প্যারীসুন্দরীর দ্বন্দ্ব, রায়ত-প্রজার ওপর কেনির অত্যাচার-নিপীড়ন, নীল স্বাধীণতা সংগ্রাম ও কেনির পরিণতি। কাহিনীর দ্বিতীয় ধারাটি গড়ে উঠেছে মোশাররফ-জনক মির মোয়াজ্জম হোসেনের সঙ্গে তার ভ্রাতুষ্পুত্রী-পতি সা গোলামের তিক্ত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোয়াজ্জম হোসেনের দাম্পত্যজীবনের ঘটনা। অবশ্য এই সমান্তরাল দ্বিধারার কাহিনীটি মাঝেমধ্যে একসঙ্গে মিশে গেছে। মোয়াজ্জম হোসেন এই দুই কাহিনীর যোগসূত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। নীলকর কেনির সুহৃদ ও সহায় হিসেবে তিনি কাহিনীর প্রথম ধারার সঙ্গে যুক্ত, আবার দ্বিতীয় ধারায়ও তিনি উপস্থিত। বিষয়-সম্পত্তিগত পারিবারিক বিরোধের পটভূমিতে কাহিনীর দ্বিতীয় ধারায় সা গোলামের আবির্ভাব, কিন্তু পরে নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের নেতা হিসেবে তিনি কাহিনীর প্রথম ধারার সঙ্গে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়েন। আপাতদৃষ্টিতে কাহিনীটিকে দুটি ধারায় বিভক্ত মনে হলেও এর পরিচর্যা মূলত কেনিকেন্দ্রিক। কেন্দ্রীয় প্রবণতার বিচারে এ কাহিনী তাই মূলত কেনি-কাহিনী। এই উপাখ্যানের কাহিনী ও স্থান-কাল-পাত্র বাস্তবভিত্তিক। কেনি, প্যারীসুন্দরী, মির মোয়াজ্জম, সা গোলাম, এসব প্রধান পাত্র-পাত্রী আঞ্চলিক ইতিহাসের অন্তর্গত বাস্তব ভূমিতেই আবির্ভূত। কেনির অত্যাচারের নানা কথার সমর্থন সমকালীন নথিপত্রে পাওয়া যায়।

নীলচাষের সঙ্গে রায়ত-প্রজার দুর্ভাগ্য-দুর্দশা গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। ‘বুনানী ধান ভাঙ্গিয়া সাহেব নীল বুনানী করিবে’ (‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’, তৃতীয় তরঙ্গ) এ ছিল নিত্যকার সাধারণ ঘটনা। মোশাররফ উল্লেখ করেছেন : “নিজের জমি উপযুক্ত সময়ে চাষ আবাদের ক্ষমতা নাই। সময় বহিয়া যাউক, রৌদ্রে পুড়িয়া যাউক, জলে ডুবিয়া যাউক, ‘জো’ সরিয়া যাউক, কার সাধ্য নীলজমি ফেলিয়া ধানের আবাদ করিতে পারে! আগে নীল, পাছে ধান। কৃষকের জীবন উপায় শস্য বপনোপযোগী জমি প্রস্তুত করিতে বিঘ্ন, বুনীতে বাধা, কর দিতেও অক্ষম। কাজেই খাবার সংস্থান অনেকেরই নাই” (দ্বাদশ তরঙ্গ)। এই ছিল নীলচাষির দুঃখের ‘বারমাস্যা’।

এই নির্যাতিত নীলচাষির গার্হস্থ্যজীবনের শোচনীয় অবস্থার ছবি মোশাররফ সহানুভূতির সঙ্গে এঁকেছেন :
“বাড়ী আসিয়া কেহ আধপেটা আহার করিয়াই কুহকিনী নিশার কুহকে পড়িয়া মাতিয়াছে। কেহ অনাহারেই মাটিতে শুইয়া পড়িয়াছে।।।। ছেলেমেয়ে দিনে খেতে পায় নাই।।।। মহাজনের বাড়ীতে গিয়া দ্বিগুণ তৃগুণ লাভ স্বীকারে ধান কর্জ্জ করিয়া আনিবেন, তাহারও সময় নাই। রাত্র প্রভাত হইতে না হইতেই আমীন খালাসী আসিয়া ধরিয়া লইয়া যায়। নীল জমীর কারকিত, চাষ ইত্যাদিতে নিযুক্ত।।।। পেটে পাথর বান্ধিয়া থাকাই অভ্যাস। দিবসে দুএক পয়সার জলপানই পূর্ণ আহার পরিশ্রমের ইতি নাই।।।। ।।। হায়রে বঙ্গ! হায়রে নীলকর!! হায়রে স্বদেশীয়!!!” (দ্বাদশ তরঙ্গ)।

নীলকরদের মধ্যে টিআই কেনিই ছিলেন সবচেয়ে কুখ্যাত। মোশাররফের বর্ণনায় জানা যায় : “সে সময় কুষ্টিয়া অঞ্চলে কেনিই রাজা, কেনিই প্রায় হর্ত্তাকর্ত্তার মালিক। যা করে কেনি।।।। নীলের উন্নতি, রেশমের উন্নতি, চতুর্দ্দিকে কেনির নাম” (চতুর্থ তরঙ্গ)। নীলকর কেনি, যার নামে ‘পুরুষের পীলে কাঁপে, গর্ভিনীর গর্ভপাত হয়’ (চতুর্থ তরঙ্গ), তার পীড়ন-নির্যাতনের ফলে উচ্চ-নীচ শ্রেণীনির্বিশেষে সব মানুষের জীবন দুর্বিষহ ও ‘জাতি, ধন, মান, প্রাণ’ বিপন্ন হয়ে উঠেছিল। অমানবিক নিষ্ঠুরতা কেনি-চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রজাপীড়নে তার জুড়ি নেই। নীলচাষের জন্য রায়ত-প্রজার ওপর তার জুলুম-জবরদস্তি ছিল সীমাহীন। অবাধ্য-অপারগ প্রজাকে শায়েস্তা করার জন্য ‘শ্যামচাঁদ’-এর প্রয়োগ ছিল অবাধ, বুনানী ধান ভেঙে নীলচাষ ছিল অতি সাধারণ ঘটনা, প্রজার সম্পদ-সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং ঘরবাড়ি ভাংচুর-লুণ্ঠন-অগ্নিসংযোগ ছিল তার নিত্যকর্মের অন্তর্ভুক্ত।

কেনির কয়েদখানা ছিল অমানবিক অত্যাচারের এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। জানা যায় : “এ গুদাম বড় ভয়ানক বন্দীখানা। সরকারী গুদামে পেট পুরিয়া না হউক, কয়েদী দুবেলা-দুমুঠো ভাতের মুখ দেখিতে পায়। এ গুদামে তা-নয়, এ বন্দীখানার সে কথা নয়, ইহার ভিন্ন ভাব অন্য কারবার বড় ভয়ানক স্থান! সেখানে শুইবার বিছানা নাই, বালিস-কাঁথা-কম্বলের নাম নাই। ভাতের মুখ দেখিবার ভাগ্যই নাই। আহারের ব্যবস্থা ধান। ধান বাছ, চাল বাহির কর, জলে মিশিয়ে গিলে ফেল” (চতুর্থ তরঙ্গ)। কেনির আক্রোশ, প্রতিহিংসা, কাম ও লোভের আগুনে নিরীহ-দরিদ্র রায়ত-প্রজার সোনার সংসার নিত্যই ভস্মীভূত হয়েছে।

কুষ্টিয়ার উকিল রাইচরণ দাস তার ‘মনের কথা অনেক কথা’ (কলকাতা, ১৩৮৪) বইয়ে ‘কেনি কাহিনী’ এবং ‘আরও কেনি কাহিনী ও স্টিফেন কাহিনী’ শীর্ষক দুটি রচনায় কেনির প্রকৃতি ও অত্যাচার সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’র আন্তরিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অত্যাচারী কেনি সম্পর্কে কিছু ধারণা মেলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক চিঠিতে। গণেন্দ্রনাথের এক চিঠির জবাবে (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৩) দেবেন্দ্রনাথ বলেছেন : “তোমার ২৭ মাঘের পত্রে নূতন প্রস্তাব হঠাৎ শুনিলাম। কেনি সাহেব ২০০০০০ টাকা দিয়া ছয় বৎসরের নিমিত্ত বিরাহিমপুর ইজারা লইবেক।।।। কেনি সাহেবের অধীনে অধুনা যে সকল প্রজা আছে তাহার মধ্যে অনেক প্রজা তাহার দৌরাত্ম্য জন্য তাহার এলাকা হইতে পালাইতেছে। বিরাহিমপুর তাহার হস্তগত হইলে এখানকারও অবস্থা তদ্রূপ হইবেক তাহার সন্দেহ নাই। ছয় বৎসর হস্তগত হইবার পরে এ জমিদারী প্রজাশূন্য দেখিতে হইবেক” (অজিত কুমার চক্রবর্তী, ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’, কলকাতা, ১৩৭৭)।

নীলকরের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার আমলার জোড়াগ্রাম সদরপুরের মহিলা জমিদার প্যারীসুন্দরীর সংগ্রামের কাহিনী মোশাররফ আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন। ‘শ্বেত রাক্ষস’ কেনির হাত থেকে নিজের রায়ত-প্রজাকে রক্ষার জন্য প্যারীসুন্দরী স্মরণীয় হয়ে আছেন। প্রজাকল্যাণই ছিল তার জীবনের ব্রত। তাই তার জমিদারি এলাকায় যখন কেনির লোভ ও অত্যাচারের হাত প্রসারিত হয় তখন তিনি স্পষ্টই ঘোষণা করেন : “আমি থাকিতে আমার প্রজার প্রতি নীলকর ইংরেজ দৌরাত্ম্য করিবে? আমি বাঁচিয়া থাকিতে আমার প্রজার বুনানী ধান ভাঙিয়া কেনি নীল বুনিবে, ইহা আমার প্রাণে কখনই সহ্য হইবে না। প্রজাদিগের দুরবস্থা আমি এই নারীচক্ষে কখনই দেখিতে পারিব না। যে উপায়ে হউক, প্রজা রক্ষা করিতেই হইবে। লোক, জন, টাকা, সর্দ্দার, লাঠিয়াল যাহাতে হয় তাহার দ্বারা প্রজার ধন, মান, প্রাণ, জালেমের হস্ত হইতে বাঁচাইতে হইবে” (তৃতীয় তরঙ্গ)।

অত্যাচারী কেনি সম্পর্কে তীব্র ঘৃণা যেমন তিনি অন্তরে পোষণ করেন, তেমনি তার জুলুম-অত্যাচারের প্রতিকার বিষয়েও তিনি সচেতন। তাই তিনি কেনিকে উদ্দেশ করে বলেন : “ও বেলাতী কুকুর, এদেশের সকলকেই দংশন করিবে। সে বিষে সকলেই জর্জ্জরীভূত হইবে। প্রথমেই এ ম্লেচ্ছের বিষদাঁত ভাঙিয়া না দিলে শেষে আমার জমিদারি পর্যন্ত গ্রাস করিয়া ভস্মীভূত করিবে” (তৃতীয় তরঙ্গ)। পাশাপাশি কেনিকে দমনের জন্য নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের এই নেত্রী ঘোষণা করেন : “।।। যে ব্যক্তি যে কোনও কৌশলে কেনির মাথা আমার নিকট আনিয়া দিবে, এই হাজার টাকার তোড়া আমি তাহার জন্য বাঁধিয়া রাখিলাম। এই আমার প্রতিজ্ঞা, আমার জমিদারী, বাড়ী, ঘর, নগদ টাকা, আসবাব যাহা আছে, সমুদয় কেনির কল্যাণে রাখিলাম। ধর্ম্মসাক্ষী করিয়া বলিতেছি, সুন্দরপুরের সমুদয় সম্পত্তি কেনির জন্য রহিল। অত্যাচারের কথা কহিয়া মুষ্টিভিক্ষায় জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিব। দ্বারে দ্বারে কেনির অত্যাচারের কথা কহিয়া বেড়াইব।।।। দুরন্ত নীলকরের হস্ত হইতে প্রজাকে রক্ষা করিতে জীবন যায় সেও আমার পণ” (দশম তরঙ্গ)।

প্যারীসুন্দরী অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত এক অসামান্য জননেত্রী। অভিন্ন শত্রুর মোকাবেলায় তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের প্রতি বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন : “।।। হিন্দু মুসলমানকে এক ভাবা চাই। শত্রুতা বিনাশ করিতে একতা শিক্ষা করা চাই। একতাই সকল অস্ত্রের প্রধান অস্ত্র। জাতিভেদে হিংসা, জাতিভেদে ঘৃণা দেশের মঙ্গল জন্য একেবারে অন্তর হইতে চিরকালের জন্য অন্তর করা চাই” (দশম তরঙ্গ)। প্যারীসুন্দরীর এই উদার মনোভাব ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি তার চরিত্রের এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্য উন্মোচিত করে। প্রজার সুখ-স্বস্তি ও নিজের সম্মান-মর্যাদা রক্ষার জন্য কেনির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্যারীসুন্দরী সর্বস্বান্ত হন। সরকার তার সমুদয় জমিদারি ক্রোক করে। পরে অবশ্য তিনি বহু শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে সেই জমিদারি উদ্ধার করেন। স্বয়ং কেনিও প্যারীসুন্দরীকে সমীহ করতেন। প্যারীসুন্দরীর অর্থ-বিত্ত ও সাহস-বুদ্ধি যে তার চেয়ে বেশি_ এ কথা কেনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তার মতো জাঁদরেল নীলকরও বলতে বাধ্য হন যে, ‘স্ত্রীলোকের মধ্যে প্যারীসুন্দরী নাম করিতেও ভয় হয়’ (একাদশ তরঙ্গ)।

ইতিহাসে উপেক্ষিতা নীল-সংগ্রামের এই বীর নারী তার চরিত্রের দৃঢ়তা, নির্ভীকতা, করুণা, সংকল্প, স্বাজাত্যবোধ ও প্রজাকল্যাণ-কামনার জন্য ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় অমর হয়ে রয়েছেন। তার প্রজাপ্রেম, নির্ভীকতা ও সাহসী ভূমিকার কথা ছড়া-প্রবাদে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে-গঞ্জে, যেমন ‘কেনির মুন্ডু কেটে লটকাবো দরজাতে,/প্যারী নাম রেখে যাবো জগতে।’ ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ছাড়াও ‘ভারত মহিলা’ (বৈশাখ-শ্রাবণ ১৩১৪) পত্রিকাতেও মোশাররফ নীলকরের বিরুদ্ধে প্যারীসুন্দরীর বীরত্বগাথা প্রকাশ করেন। নীলকর-সুহৃদ মোশাররফের পিতাও মুগ্ধ ও সহানুভূতিশীল ছিলেন এই নির্ভীক প্রজাদরদি সামন্ত নারীর প্রতি। তিনি প্যারীসুন্দরীর প্রজাদের দুরবস্থার কথা শুনে ব্যথিত হয়েছেন, আবার তার প্রতিরোধ-আক্রমণে কেনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে তিনি সোৎসাহে মন্তব্য করেন : “ধন্য বাঙ্গালীর মেয়ে। সাবাস সাবাস! সাহেবকে একেবারে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। সাহেব এতদিন সকলকে যেরূপ জ্বালাতন করিয়াছেন, তাহার প্রতিশোধ বুঝি প্যারীসুন্দরীর হাতে হয়” (একাদশ তরঙ্গ)।

তবে অন্তরে কেনির প্রতি গোপন ক্ষোভ বা প্যারীসুন্দরীর প্রতি সহানুভূতি থাকলেও মোশাররফের পিতা মূলত নীলকরের পক্ষেই ভূমিকা পালন করেন। নীলকর কেনির সঙ্গে তার ‘গাঢ়রূপে প্রণয় ছিল’ এবং অন্য নীলকর কুঠিয়ালদেরও তিনি ছিলেন ‘বিশেষ হিতৈষী বন্ধু’।’ নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের সময়ে ‘মির সাহেব নীলকরের পক্ষ, সা গোলাম প্রজার পক্ষ’ (অষ্টাত্রিংশ তরঙ্গ)। অঞ্চলের সব মানুষ নীলকর কেনির পক্ষ ত্যাগ করলেও মোশাররফ-পিতা গোপনে তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের নেতা সা গোলামের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় তিনি ছিলেন কেনির পক্ষের সাক্ষী।

মোশাররফ নিজেও নীলকর প্রসঙ্গে কখনও কখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘নীলদর্পণ’ রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্র সম্পর্কে তার ধারণা ও মন্তব্য উদার ছিল না। তিনি বলেছেন : “দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণে’ নীলকরের দৌরাত্ম্য অংশই চিত্রিত করিয়া গিয়াছেন।।।। দীনবন্ধুবাবু ইংরেজের ত্রুটি, ইংরেজের কুৎসা গাহিয়া গিয়াছেন। ইংরেজ মধ্যে যে দেব ভাব আছে, প্রজার প্রতি মায়া-মমতা-স্নেহ এবং ভালোবাসার ভাব আছে তাহা তিনি চক্ষে দেখিয়াও প্রকাশ করেন নাই। যে ইংরেজ জাতির নেমক-রুটি খাইয়া বহুকাল জীবিত ছিলেন,।।। সেই ইংরেজের কুৎসা গান করিয়া দু’শ’ বাহবা গ্রহণ করিয়াছেন।।।। ইহারই নাম ‘পাতফোঁড়’ যে পাতে খান, সেই পাতেই ছিদ্র করেন” (‘আমার জীবনী’, পৃ। ৯১)। অবশ্য অন্যত্র তিনি দীনবন্ধুকে ‘দীনবন্ধু’ এবং ‘নীলদর্পণ’কে ‘মহামূল্য দর্পণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তবে মোশাররফ নীলচাষিদের বিক্ষোভ ও নীল স্বাধীণতা সংগ্রামের ঘটনা যেভাবে বিবৃত করেছেন তাতে তার মনোভাব যে পুরোপুরি নীলকরের অনুকূলে ছিল না তা বেশ বোঝা যায়। পাবনায় ‘বঙ্গেশ্বর’-এর দরবারে নির্যাতিত প্রজাসাধারণের নীলচাষ সম্পর্কে পেশকৃত বক্তব্য মোশাররফ আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন : “ধর্ম্মাবতার! আমরা মজুরী চাই না। ভিক্ষা করিয়া খাইব তবু নীলের বীজ আর হাতে করিব না।।।। আমরা কিছুতেই আর নীল বুনিব না (চতুস্ত্রিংশ তরঙ্গ)। কিংবা সাহসী রায়ত-প্রজার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত তাদের নিজের জবানিতে পেশ করেছেন : “আর কার সাধ্য আমাদের জমিতে জবরাণে নীল বোনে। সকলে এক যোট থাকলে ভয় কি ভায়া? যে ব্যাটা আমাদের জমীতে নীল বুনতে কি চাষ দিতে আসবে; সে ব্যাটার মাথা আগে ভাঙ্গবো। প্রাণ দিব তবু নীল বুনিব না। নীল বুনিতে জমিও দিব না” (পঞ্চত্রিংশ তরঙ্গ)।

‘বাঙ্গালায় নীলকরের অধঃপতনে’ ‘প্রজার আনন্দের সীমা নাই’। মোশাররফ নীলচাষিদের প্রতিক্রিয়ার বিশদ বর্ণনা দিয়ে শেষে নিজে মন্তব্য করেছেন, ‘দেশের লোক যেন মহাকালের হস্ত হইতে উদ্ধার পাইল’ (দ্বিচত্বারিংশ তরঙ্গ)। নীলকর প্রসঙ্গে মোশাররফ-মানসে একটি দ্বন্দ্ব জাগ্রত থাকলেও নীলকরের দৌরাত্ম্য-নিবারণ ও নীলচাষ-বিলুপ্তিতে তার সায় ছিল এবং নির্যাতিত নীলচাষির জন্য তার অন্তরে প্রচ্ছন্ন ছিল গভীর সহানুভূতি ও মমত্ববোধ এই ধারণা পোষণ হয়তো অসঙ্গত নয়।

(সূত্রঃ আবুল হাসান চৌধুরী, মির মোশারফ হোসেনের উদাসীন পথিকের মনের কথা)