লিখছেন, সৌম্য মন্ডল, রাজনৈতিক কর্মী

দেশ জুড়ে বাঙালি নির্যাতনের প্রেক্ষিতে দেখা গেল কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পুনরাবৃত্তি। বাংলার বাবু বিবি কলমবাজেরা মানতে নারাজ যে বাঙালি শ্রমিকদের উপর আক্রমণটা আসলে বাঙালির উপর আক্রমণ! যেমন  কলম্বাসের শ্রীচরণ আমেরিকার মাটি ছোঁয়ার  বহু আগে সেখানে মানব সভ্যতা গড়ে উঠলেও কলম্বাসই প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেছে মানতে হবে, কারণ ইউরোপীয় সাদা চামড়ার উপনিবেশিকরা যা দেখেনি, তার এই ব্রহ্মান্ডে কোনো অস্তিত্ব নেই, ইউরোপীয়রা যে দিন খুঁজে পাবে সেদিনই সেটা আবিষ্কার হবে। অন্যদিকে বাংলার বাবু সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবীদের মতে – ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিদের ডিটেনশন সেন্টারে আটক হওয়া বা পুশব্যাক নিতান্ত নথিপত্র না থাকার সমস্য। যেন যাবতীয় বুদ্ধি সম্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবীদের কাছেই কুক্ষিগত, অন্যদিকে এই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা একেবারে নির্বোধ, তারা বাইরে কাজ করতে গেলে ভোটার আধার নিয়ে যায় না। এদিকে ডিটেনশন বা বাংলাদে্শে পুশব্যাক ফেরত শ্রমিকরা বাববার অভিযোগ করেছে যে সব নথি দেখাবার পরেও সেই নথিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, বা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের কাছে ভেরিফাইও করা হয়নি। বাংলা ভাষা শুনেই বাংলাদেশী বলে নির্যাতন করা হয়েছে।

আবার কারও মতে- বাংলা ভাষা নয়, বাংলার শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও বাঙালির সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশই খেটে খাওয়া গরীব মানু্‌ষ, যাদের একাংশ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বা ফেরিওয়ালা হয়ে ভিন রাজ্যে যায়।

মানুষকে বাদ দিয়ে ভাষা হয় না। বলা ভালো মানুষ বিচ্ছিন্ন ভাষার কোনো অস্তিত্ব নেই। মানুষের উচ্চারণের মধ্যেই যেহেতু ভাষা টিকে থাকে। তাই ভাষাকে আক্রমণ করার অর্থ যেমন ঐ ভাষায় ভাব প্রকাশ করা মানুষের আক্রান্ত হওয়া, আবার উলটো দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট ভাষাকে ধারণ করা মানুষকে আক্রমন করাটা প্রায়শই সেই ভাষাকে আক্রমণ হয়ে ওঠে।

এবার সমস্যা হল জাত বা শ্রেনী বিভক্ত সমাজের অভিজাত জাত বা শ্রেনীর মানুষদের বংশপরম্পরায় আহরিত এক ধরনের মূর্খামি থাকে, এই ঐতিহ্যগত মুর্খামি অনেক সময় তাদের গভীর অধ্যায়নের মাধ্যমে আহরিত জ্ঞানের দুধে এক ফোঁটা চোনার কাজ করে থাকে। এই মূর্খামি থেকেই এই ধারণা জন্মায় যে গরীব শ্রমজীবী বাঙালিদের আক্রান্ত হওয়াটা বাঙালির আক্রান্ত হওয়া নয়। কলম্বাস বা ইউরোপীয়রা কোথাও না পৌছালে যেমন তার অস্তিত্ব নেই, তেমনি বাঙালি বাবু সম্প্রদায় আক্রান্ত না হলে, সেটা বাঙালির আক্রান্ত হওয়া নয়। এটা ঔপনিবেশিক ব্যাবস্থার গর্ভে জন্মনেওয়ার জন্য বুদ্ধিজীবীর মানসিক গঠন এমন অসংবেদনশীল, নাকি সাধারণভাবে কাস্ট ক্লাস বিভক্ত সমাজে এটাই স্বাভাবিক, সেটা গবেষকরা বলতে পারবে।

যদিও হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদীরা এই বাজারে বাবু বুদ্ধিজীবীদের মানসম্মান রাখতে নারাজ। পুনেতে উন্মত্ত জনতা এবং পুলিশ এমন একজনের পরিবারকে বাংলাদেশী দাগিয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলেছে, যিনি প্রাক্তন সেনা, হাকিমুদ্দিন শেখ, সে পরিযায়ী শ্রমিকও নয়, বাঙালিও নয়, উত্তর প্রদেশে তার জন্ম। সামাজিক মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালিরা, কর্পোরেট কর্মচারীরা, ছাত্ররা গত কয়েক বছরে তাদের বাঙালি পরিচিতির জন্য মানসিক হেনস্থার অভিযোগ জানাতে শুরু করেছে।  যদিও এখন পর্যন্ত শারীরিক আক্রমণ শুধুমাত্র দরিদ্র মানুষের উপর সীমাবদ্ধ, তবে  ক্রমশ এটা বাবুদের দিকে ধেয়ে আসতে বাধ্য।  

এর কারণ যা হচ্ছে তা নেহাত বিদেশী বিতাড়ন বা ২০২৬ সালের নির্বাচন কেন্দ্রীক কিছু নয়, তার থেকে বেশি কিছু।

মূলত তিন ধরনের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে – ১) যারা বাংলাদে্‌শ থেকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে বেআইনি ভাবে আসতো। কাজ শেষ হয়ে গেলে আবার নিজের দেশে ফেরত যেত।  বাংলাদেশেই যেহেতু এদের স্থায়ী বাড়ি, ফলত এদের সমস্যাটা অন্য জায়গায়,  সেটা হল ভারতের নিরাপত্তারক্ষীদের অমানবিক আচরণ। যা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এরা মূলত মুসলিম।  ২) ভারতেরই নাগরিক কিন্তু বাঙালি বিদ্বেষ বা মুসলিম বিদ্বেষের কারণে তাদের ডিটেনশনে দেওয়া হচ্ছে বা ডিপোর্ট করা হচ্ছে। এদের ব্যাপারটাও আইনিভাবে লড়া যায় কারণ এদের সাথে যা হচ্ছে সেটা বেআইনি ভাবে হচ্ছে। এই অংশে হিন্দু মুসলিম দুই পক্ষই আছে। ৩) বাঙালি উদ্বাস্তু, যাদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ নমশূদ্র মতুয়া। ২০০৩ সালের নাগরিক আইনের কারণে এরা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, শুধু তাই নয়, এদের নাগরিক হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনি আইন ২০১৯ একটি ভাওতা প্রমাণিত হয়েছে, যা এদের জন্য নয়। এই অংশের মানুষদের আইনিভাবে ডিটেনশনে থাকার কথা বা ডিপোর্ট হওয়ারই কথা। যদিনা এক নতুন আইন পাস হয় যেখানে এখনো পর্যন্ত ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসরত প্রত্যেককে নাগরিক ঘোষণা করে।

মাথায় রাখতে হবে বিহারে SIR এ ৬৫ লাখ মানুষের নাম বাদ গেছে, বাংলার ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াবে এখনই তা অনুমান করা যাচ্ছে না। কারণ বাংলার মাটি এবং মানুষকে চিঁরে দেশ ভাগ হয়েছে, বিহারের ক্ষেত্রে এমন হয়নি। বাঙালি উদ্বাস্তুরা এসে মুলত পশ্চিমবঙ্গেই থেকেছে। ১৯৭১ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও অনেকেই অসচেতনতার জন্য আবেদন করে নাগরিকত্ব নেয়নি বা নাগরিকত্বের সংশাপত্র সংরক্ষণ করেনি। ১৯৭১ সালের ইন্দিরা মুজিব চুক্তির পর ২০২৪ সালে ক্যা২০১৯ এর মাধ্যমে হাতে গোনা যে কয়জন নাগরিকত্ব পেয়েছে, তার মাঝে ভারত সরকার কোনো বাংলাদেশিকে নাগরিকত্ব দেয়নি। ফলত ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারীর পর ভারতে আসা বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই নাগরিক নয়, ৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভারতে আসা একজনও নাগরিক নয়। এবার এই মানুষেরা নাগরিক না হলেও বিভিন্ন ভাবে তারা ভোটার কার্ড বানিয়ে নেওয়ার বাঙালি ভোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। 

এর আগে ১৯৫২–৫৬, ১৯৫৭, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৮৩–৮৪, ১৯৮৭–৮৯, ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৫, ২০০২, ২০০৩, এবং ২০০৪ সালে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন SIR হয়েছে।।কিন্তু কোনোবার এত হৈচৈ হয়নি। এইবারের SIR এর সাথে অতীতের সমস্ত SIR এর যেটা পার্থক্য, সেটা হল- এই SIR এর আগে আছে  ২০০৩ এর নাগরিক আইমের ১৪এ ধারা, যা ৩ডিসেম্বর ২০০৪ থেকে লাগু হচ্ছে, যেখানে অবৈধদের বাছাই করে বাদ দিয়ে নাগরিকপঞ্জি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, এবং এই SIR এর পর হবে ডি লিমিটেশন, অর্থাৎ লোকসভা আসনের পুনর্বণ্টন হবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি পরিযায়ী শ্রমিকদের (অধিকাংশ মুসলিম)  অন্য রাজ্যের ভোটার করে দেওয়া হয় এবং উদ্বাস্তুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়, তবে ২০২৬ এর নির্বাচন বিজেপির হাতছাড়া হলেও সামগ্রিক ভাবে আগামী ডিলিমিটেশনে বাংলার লোকসভার আসন সংখ্যার ব্যাপক হ্রাস হবে।

ভারতে পুরনো সংসদ ভবনে লোকসভায় সর্বোচ্চ ৫৫২টি আসন ছিল, বর্তমানে ৫৪৩ জন সদস্য লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন। রাজ্যসভায় সর্বাধিক ২৫০টি আসন থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণত ২৪৫ জন সদস্য থাকেন। ডি-লিমিটেশনকে মাথায় রেখে নতুন সংসদ ভবনে লোকসভা কক্ষে ৮৮৮ টি এবং রাজ্যসভা কক্ষে ৩৮৪ টি আসন রাখা হয়েছে।

গো বলয়ে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে মাথায় রেখে পর্যবেক্ষকরা অনুমান করছেন আগামী ডি-লিমিটেশন  এর পর লোকসভায় উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসন এর সাথে ৪৮টি যুক্ত হয়ে হবে ১২৮, বিহারের ৪০টি আসনের সাথে ৩০টি যুক্ত হয়ে হবে ৭০, রাজস্থানের ২৫ টি আসনের সাথে ১৯টি আসন যুক্ত হয়ে হবে ৪৪টি। সব মিলিয়ে গো বলয়ে ১১৫টির বেশি আসন বৃদ্ধির সম্ভবনা আছে। এছাড়া গুজরাট হরিয়ানার মত উগ্র-হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত রাজ্যের আসন সংখ্যা না হয় আলোচনার বাইরে রাখা হল।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে ৮-২৪ টি আসন যুক্ত হয়ে ৪২ থেকে বেড়ে ৫০-৬০ টি, কেরালায় বর্তমানের ২০ টি আসন থেকে ৬-৭টি কমে ১৩ থেকে ১৪টি, তামিলনাড়ুর ৩৯টি আসনের ৭-৯টি কমে ৩১-৩২ টি হওয়ার সম্ভবনা আছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। SIR এবং NPR এর প্রক্রিয়ার ফলে বাংলার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে ব্যাপক ভোটার হ্রাস হতে বাধ্য। এর ফলে গো বলয় জিতলেই দিল্লি জেতা হয়ে যাবে। গো বলয় জিতলেই গোটা ভারতের সমস্ত জাতির ভাষা, অর্থনীতি, ভাগ্য সমস্তকিছু নির্ধারণ করা যাবে।  ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরালার মত রাজ্যগুলো সাংসদদের কোনো দরকষাকষির ক্ষমতা বা ভাগিদারী হারিয়ে পরিণত হবে নিতান্ত উপনিবেশে। এই পরিস্থিতি অবশ্যই শুধু শ্রমজীবী মানুষ নয় সামগ্রিক ভাবে বাঙালি বাবু শ্রেনীর সামাজিক অবস্থানেও ব্যাপক ধ্বস নামাতে বাধ্য। আর নিজেদের নাকউচু দৃষ্টিভঙ্গির জন্য গরীব শ্রমজীবী বাঙালির উপর অত্যাচারকে বাঙালির উপর অত্যাচার হিসেবে দেখতে অস্বীকার করার জন্য বাঙালির আত্মরক্ষার লড়াইয়ে অন্তর্ঘাতের জন্যেও ইতিহাসের পাতায় অভিযুক্ত হয়ে থাকবে এই বাবু সমাজই।