
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বাংলার আড়ং ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।
তাঁত-উৎপাদন ব্যবস্থায় মহিলা প্রাধান্য শেষ হয়েছে।
সাধারণ কারিগর নিজেদের প্রযুক্তি, জ্ঞান, দক্ষতার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।
বিটি-তুলো চাষ করে, কারিগরদের কাঠামো ধ্বংস করে মিলের কাপড়ের কাঠামো তৈরি করতে অত্যুৎসাহীরা, সাধারণ তাঁতি কীভাবে তার ধসে যাওয়া উৎপাদন কাঠামো নতুন করে তৈরি করতে পারবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামান না। অথচ, কারিগর ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মোটা কাপড় তৈরির ভূমিগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে, সেই ব্যবস্থাই কারিগরকে বাঁচিয়ে রাখে। গ্রামের কারিগরের দক্ষতা, জ্ঞান, শ্রম উদ্বৃত্ত লুঠ হয়ে ইওরোপ-আমেরিকা যাওয়ার প্রবণতা পলাশীর ২৫০ বছরে ক্রমশ বেড়েছে। কারিগরেরা, কারিগর সংগঠকেরা, কারিগর ব্যবস্থার ধ্বংসকে ভাগ্যফল হিসেবেই গণ্য করে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
মনে রাখতে হবে, তাঁত ব্যবস্থা একটি বাস্তুতন্ত্র; অর্থাৎ তাঁতির কাজ নির্ভর করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারিগরের কাজের গুণমানের ওপর, তার পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থার ওপরে। আজকের আর্থব্যবস্থায় দক্ষ কারিগর অদৃশ্য।
গত আড়াইশ বছর ধরে একে একে আড়ং ব্যবস্থার ধাপগুলি ধ্বংস হয়েছে অর্থাৎ তাঁতের সঙ্গে জুড়ে থাকা অন্যান্য কারিগর সরে গিয়ে শুধুমাত্র তাঁতি-নির্ভর হয়েছে এই উৎপাদন ব্যবস্থা।
এখন বাংলায় দেশীয় পদ্ধতিতে তুলো উৎপাদন আর হয় না। সেটা বড় সমস্যা। সে প্রবণতা ব্রিটিশেরা বন্ধ করে দিয়েছে, আমরা ফেরাতে পারি নি, উৎসাহী হই নি। কারিগরেরাও খুব একটা উৎসাহী এমনও বোঝা যায় নি। চরকা কাটনি এবং প্রাকৃতিক রঙের রঞ্জক (ডাই মাস্টার), ধোলাই করার দক্ষ কারিগর আজ প্রায় অদৃশ্য – সেগুলি এখন মিল থেকে কেনা কাঁচামালে সাধিত হয়, কোনও কোনও কাজের আজ দরকারই হয় না। চরকা কাটনি আর রঞ্জক তাঁতিরা যে রোজগার করত এবং তাঁতি তাঁদের থেকে পণ্য কিনে যে লাভ সঞ্চয় করত সেইটা সমাজে থেকে যেত, সমাজে ঘুরত। সেই উদ্বৃত্তের কিছুটা তাঁত ব্যবস্থা পাস করে দিত ভোক্তাদের কাছে – ভোক্তারা কম মূল্যে পণ্য পেত – গোটা বাস্তুতন্ত্র একযোগে কাজ করত – প্রচুর কর্মসংস্থান হত। কাপড় তৈরি খরুচে ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ তাঁতের সঙ্গে জুড়ে থাকা কারিগরদের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। মহিলারা যে কোনও কারিগরি এবং কারিগর ব্যবস্থার অক্ষদণ্ড। তারা তাঁত ব্যবস্থায় প্রায় নেই – কিছু সামান্য নাটাই ইত্যাদি পারিবারিক কাজে হাত লাগানো ছাড়া। গ্রামে এক সময়য় সর্বস্তরের মহিলা সুতো কাটতেন। সেটা ধ্বংস হয়েছে। গ্রামে বিপুল কর্মসংস্থান হয় না। ফলে গ্রামের মানুষের তাঁত নির্ভরতা চলে যাচ্ছে।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া আড়ং-এর অবকাঠামো যদি না তৈরি করা যায় তাহলে আমজনতার জন্যে হাতে তৈরি তাঁতের বিলয় সময়ের অপেক্ষা। তাঁতের কাপড় বেচা হবে শুধুই ধনীদের চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে।
এখন পড়া যাক ২০০ বছর আগের ভাঙা সময়ে এক চরকা কাটনি কারিগরের চিঠি, ১৮২৮- এ অনামা সুতা কাটনি যখন এই চিঠি লিখছেন, ততদিনে ছিয়াত্তরের গণহত্যায় ১ কোটি বাঙালি মারা গেছে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত লাগু, বাংলার কারিগরি ব্যবস্থার বিশিল্পায়ন শুরু হয়ে গেছে – লক্ষ লক্ষ চরকা কাটনি কাজ হারিয়েছেন, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার দখল হয়ে গেছে, ঢাকার মত প্রচুর আড়ং এবং শহর জনশূণ্য হয়েছে, মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার জমিদারির অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, পলাশীর পরে বাংলা থেকে অযুত সম্পদ লন্ডনে গিয়ে ইওরোপের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেই সময়ের এক সুতা কাটনির আর্তনাদ শুনুন। একেই প্রতিস্থাপিত করে, স্থানীয় স্তরে মহিলাদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগই আজকের প্রকৃত নারী স্বনির্ভরতার প্রকল্প গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
‘শ্রীযুত সমাচার পত্রকার মহাশয়। আমি স্ত্রীলোক অনেক দুঃখ পাইয়া এক পত্র প্রস্তুত করিয়া পাঠাইতেছি আপনারা দয়া করিয়া আপনারদিগের আপন ২ সমাচারপত্রে প্রকাশ করিবেন শুনিয়াছি ইহা প্রকাশ হইলে দুঃখ নিবারণকর্ত্তারদিগের কর্ণগোচর হইতে পারিবেক তাহা হইলে আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইবেক অতয়েব আপনারা আমার এই দরখাস্তপত্র দুঃখিনী স্ত্রীর লেখা জানিয়া হেয়জ্ঞান করিবেন না।
আমি নিতান্ত অভাগিনী আমার দুঃখের কথা তাবৎ লিখিতে হইলে অনেক কথা লিখিতে হয়। কিন্তু কিছু লিখি যখন আমার সাড়ে পাঁচ গণ্ডা বয়স তখন বিধবা হইয়াছি কেবল তিন কন্যা সন্তান হইয়াছিল। বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি আর ঐ তিনটি কন্যা প্রতিপালনের কোন উপায় রাখিয়া স্বামি মরেন নাই তিনি নানা ব্যবসায়ে কাল যাপন করিতেন আমার গায়ে যে অলঙ্কার ছিল তা বিক্রয় করিয়া তাঁহার শ্রাদ্ধ করিয়াছিলাম শেষে অনাভাবে কএক প্রাণী মারা পড়িবার প্রকরণ উপস্থিত হইল তখন বিধাতা আমাকে এমত বুদ্ধি দিলেন যে জাহাতে আমারদিগের প্রাণ রক্ষা হইতে পারে অর্থাৎ আসনা ও চরকায় সুতা কাটিতে আরম্ভ করিলাম প্রাতঃকালে গৃহকর্ম্ম অর্থাৎ পাটি ঝাট্টি করিয়া চরকা লইয়া বসিতাম বেলা দুই প্রহর পর্য্যন্ত কাটনা কাটিতাম প্রায় এক তোলা সুতা কাটিয়া স্নানে যাইতাম স্নান করিয়া রন্ধন করিয়া শ্বশুর শাশুড়ি আর তিন কন্যাকে ভোজন করাইয়া পরে আমি কিছু খাইয়া সরু টেকো লইয়া আসনা সূতা কাটিতাম তাহাও প্রায় এক তোলা আন্দাজ কাটিয়া উঠিতাম এইপ্রকার সূতা কাটিয়া তাঁতিরা বাটীতে আসিয়া টাকায় তিন তোলার দরে চরকার সূতা আর দেড় তোলার দরে সরু আসনা সূতা লইয়া যাইত এবং যত টাকা আগামি চাহিতাম তৎক্ষণাৎ দিত ইহাতে আমাদের অন্ন বস্ত্রের কোন উদবেগ ছিল না পরে ক্রমে ২ ঐ কর্ম্মে বড়ই নিপুন হইলাম কএক বৎসরের মধ্যে আমার হাতে সাত গণ্ডা টাকা হইল এক কন্যার বিবাহ দিলাম ঐ প্রকারে তিন কন্যার বিবাহ দিলাম তাহাতে কুটুম্বতার যে ধারা আছে তাহার কিছু অন্যথা হইল না রাঁড়ের মেয়্যে বলিয়া কেহ ঘৃনা করিতে পারে নাই কেননা ঘটক কুলীনকে যাহা দিতে হয় সকলি করিয়াছি ততপরে শ্বশুরের কাল হইল তাঁহার শ্রাদ্ধে এগার গণ্ডা টাকা খরচ করি তাহা তাঁতিরা আমাকে কর্জ্জ দিয়াছিল দেড় বৎসরের মধ্যে তাহা শোধ দিলাম কেবল চরকার প্রাসাদাৎ এত পর্য্যন্ত হইয়া ছিল এক্ষনে তিন বৎসরাব্ধি দুই শাশুড়ি বধূর অন্নাভাব হইয়াছে সূতা কিনিতে তাঁতি বাটীতে আসা দূরে থাকুক হাটে পাঠাইলে পুর্ব্বাপেক্ষা সিকি দরেও লয় না ইহার কারন কি কিছুই বুঝিতে পারি না অনেক লোককে জিজ্ঞাসা করিয়াছি অনেকে কহে যে বিলাতি সূতা বিস্তর আমদানি হইতেছে সেই সকল সূতা তাঁতিরা কিনিয়া কাপড় বুনে। আমার মনে অহঙ্কার ছিল যে আমার যেমন সূতা এমন কখন বিলাতি সূতা হইবেক না পরে বিলাতি সূতা আনাইয়া দেখিলাম আমার সূতা হইতে ভাল বটে তাঁহার দর শুনিলাম ৩।৪ টাকা করয়া সের আমি কপালে ঘা মারিয়া কহিলাম হা বিধাতা আমা হইতে দুখিনি আর আছে পুর্ব্বে বিলাতে তাবৎ লোক বড় মানুষ বাঙ্গালি সব কাঙ্গালী এক্ষণে বুঝিলাম আমা হইতেও সেখানে কাঙ্গালিনী আছে কেননা তাঁহারা যে দুঃখ করিয়া এই সূতা প্রস্তুত করিয়াছে সে দুঃখ আমি বিলক্ষণ জানিতে পারিয়াছি এমত দুঃখের সামগ্রী সেখানকার হাটে বাজারে বিক্রয় হইল না একারণ এ দেশে পাঠাইয়াছেন এখানেও যদি উত্তম দরে বিক্রয় হইত তবে ক্ষতি ছিল না তাহা না হইয়া কেবল আমারদিগের সর্ব্বনাশ হইয়াছে সে সূতায় যত বস্ত্রাদি হয় তাহা লোকে দুই মাসও ভালরূপে ব্যবহার করিতে পারে না গলিয়া যায় অতয়েব সেখনাকার কাটনিদিগকে মিনতি করিয়া বলিতেছি যে আমার এই দরখাস্ত বিবেচনা করিলে এদেশে সূতা পাঠান উচিত কি অনুচিত জানিতে পারিবেন। শান্তিপুর কোন দুঃখিনী সূতা কাটনির দরখাস্ত। সং চং’
(সমাচার চন্দ্রিকা, ৫ জানুয়ারি ১৮২৮, ২২ পৌষ ১২৩৪)
