• বিশ্বেন্দু নন্দ

ক্ষমতার আঞ্চলিকিকরণ হোক, কিন্তু জ্ঞান যেহেতু সবচেয়ে দরকারী, তার কেন্দ্রীভবন বাধ্যতামূলক; Power may be localized, but knowledge, to be most useful, must be centralized.

জন স্টুয়ার্ট মিল, কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট (1861)

ঊনবিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে তুলা, চা এবং অন্য বাণিজ্যিক পণ্য ছাড়াও, সাপও লন্ডনে গিয়েছে। বিভিন্ন রঙের সাপ লন্ডনের বন্দরে নামত – “বিষাক্ত,” “নিরাপদ,” “সাধারণ,” “বিরল,” ইত্যাদি শ্রেণীবিভক্ত হয়ে।১ তুলার মতোই সাপও ব্রিটেনে এক ধরণের পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল ছিল। এই বিদেশী উপাদান বা নমুনা ব্যবহার করা হয়েছে প্রকাশনা আর প্রদর্শনীর জন্য। কিন্তু, প্রক্রিয়া করা তুলো কাপড়ে/সুতোয় রূপান্তরিত হয়ে ভারতীয় বাজারে ফিরে এলেও, প্রাকৃতিক ইতিহাস এবং অন্য বিজ্ঞানচর্চার কোম্পানির উৎপাদন কিন্তু ইউরোপীয় বাজারের ভোগের জন্যই উৎপাদিত হত। সাপ যেত মালয়, চীন, নিউ সাউথ ওয়েলসের মতো অঞ্চল থেকে। আমদানি করা পণ্য লন্ডনের পণ্য এক্সচেঞ্জে বিক্রি করা হলেও সাপ কিন্তু আলাদা করে, লন্ডনে কোম্পানির অফিসের সেলারে সংরক্ষণ করা হয়েছে অতি যত্নে। সেলারের পণ্য নমুনার কিছু অংশ কেনাবেচা হত, কিছু উপহার হিসাবে দেওয়া হত। তবে অধিকাংশ সময় এগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাড়তে থাকা প্রাকৃতিক এবং আর্টিফিসিয়াল প্রোডাকশনের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত থেকেছে। বিশ্বজোড়া বাজার আর শাসনক্ষেত্র থেকে জড়ো করা নানান উপাদান – যেমন বিভিন্ন ধরণের সরীসৃপ, উদ্ভিদ, প্রাণী, শিলা, খনিজ, প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু, শিল্পকর্ম, পাণ্ডুলিপি, রেকর্ড ইত্যাদি প্রদর্শিত হত কোম্পানির পরিচালন কেন্দ্র লিডেনহল স্ট্রিটের বেসমেন্ট এবং বিশাল জাদুঘরের প্রদর্শনীতে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাদুঘর, গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয় ১৮০১-তে। কোম্পানির চরিত্রের মতোই এই জাদুঘর-গ্রন্থাগার কিন্তু কর্পোরেট আর রাষ্ট্রের মিলিজুলি সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়েছে, পরিচালিতও হয়েছে। অর্থ এসেছে ভারতে আদায় করা রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে। কোম্পানির এই জাদুঘর-গ্রন্থাগার এমন এক সরকারের সম্পত্তি ছিল, যে সরকার চালাত শেয়ারহোল্ডাররা। জাদুঘর কোম্পানির নামে পরিচালিত হলেও, জনগণ একে ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান পাবলিক জাদুঘর মানত। আনুষ্ঠানিক নাম অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মিউজিয়াম, জনলব্জে ইন্ডিয়া মিউজিয়াম। আঠের শতের মাঝামাঝি এই জাদুঘর-গ্রন্থাগার সমগ্র ইউরোপিয় গবেষকের কাছে এশিয়ার বিস্তৃততম তথ্য সংগ্রহের আকর হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মতো, কোম্পানির মিউজিয়ামও লন্ডনে ঘুরতে আসা ভ্রমণ পিয়াসীদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠবে। এর প্রদর্শন বিশ্বজোড়া প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে। তবে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে জ্ঞান উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে। ১৮৫৮-তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উঠে গেলে এবং কোম্পানির শাসন অঞ্চল সরাসরি ক্রাউন শাসনের অধীনে এলে, জাদুঘরের বিপুল সংগ্রহ হোয়াইটহলে চলে যায়। ১৮৭০-এর দশকের শেষের দিকে পুনর্গঠিত ইন্ডিয়া মিউজিয়ামকে ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়া হবে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, কিউ গার্ডেন, সাউথ কেনসিংটনের নতুন জাতীয় জাদুঘর কমপ্লেক্সে।

কোম্পানির মিউজিয়াম এবং লাইব্রেরি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস আর্কাইভিস্ট রে ডেসমন্ড আর মিলড্রেড আর্চারের।2 এখনও পর্যন্ত, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে বিজ্ঞান বিকাশের ইতিহাসচর্চায় এই জাদুঘরের অবদান খুব বেশি আলোচিত নয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিপুল বিজ্ঞানচর্চা গবেষণার সিংহভাগ ভারতভূম ঘটনাবলী নির্ভর।3 তাই কোম্পানির জাদুঘরচর্চা কেবল বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্বন্ধে নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে না, বরং কোম্পানির “উপনিবেশিক” বিজ্ঞান যে কেন্দ্র/পরিধি বিভাজনে আবদ্ধ ছিল না, সেই ধারণা তৈরি করে।

ডেসমন্ড এবং আর্চারের কাজের পাশাপাশি ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ব্রিটিশ জাদুঘর এবং লন্ডনের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের সংরক্ষণাগারের উপাদানের উপর ভিত্তি করে, জেসিকা র‍্যাটক্লিফ এই প্রবন্ধে কোম্পানি জাদুঘরের প্রথম সময়ের ইতিহাসে বিজ্ঞানের উপাদান যেমন নমুনা, রেকর্ড, পর্যবেক্ষণ, তথ্য এবং বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহে কোম্পানির ভূমিকা চিহ্নিত করে বিজ্ঞান আর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের মধ্যেকার সম্পর্ক খুঁজেছেন।4 সাম্রাজ্য আর রাষ্ট্রের দপ্তরগুলোর মধ্যে, সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগের কব্জা হিসাবে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক প্রকল্প উনিশ শতের ব্রিটেনভূমের রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান অদ্ভুত এক ক্ষেত্রে প্রবেশের রাস্তা তৈরি করেছে। র‍্যাটক্লিফ, ব্রিটেনে বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাতন্ত্রের সম্পর্ক আলোচনা করেন।

এই প্রবন্ধে জেসিকা সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান এবং বৈজ্ঞানিক অনুশীলন নির্ভরশীল বস্তুগত সংস্কৃতির (material culture) ইন্টারসেকশনকে ফোকাস করে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম বিশ্বের (artificial world) ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণাগারে সংরক্ষিত নমুনা সূত্রে সেই সময়ের বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিকচর্চায় ঘটতে থাকা পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেন। ১৭৫০ থেকে ১৮৫০-র মধ্যে ইউরোপ যে সব নতুন তথ্য সংগ্রহ করছে, যে বিষয়ে পিটার বার্ক-এর ‘বিশ্বের অন্য অংশের প্রাণী, উদ্ভিদ, ভূগোল এবং ইতিহাস সম্পর্কে ইউরোপীয়দের সংগৃহীত জ্ঞান অবাক করে (was staggering, especially the knowledge collected by Europeans about the fauna, flora, geography and history of other parts of the world)’ মন্তব্যকে আমরা স্বচ্ছন্দে কোম্পানির জাদুঘর সঙ্গঠনের উদ্যম চিহ্নিত করতেও ব্যবহার করতে পারি।৫ ইতিহাসবিদদের মতে এই যুগে বিজ্ঞানে নাটকীয় পরিবর্তন আসছে – ভূতত্ত্ব, জীবাশ্মবিদ্যা, আবহাওয়াবিদ্যা, সমুদ্রবিদ্যা, ভৌত আর উদ্ভিদবিদ্যার মতো নতুন অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক এবং তথ্য-নিবিড় শাখার উত্থান হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক সমিতির সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে এবং পেশাদারিত্বের সম্প্রসারণ হয়েছে, নতুন পদ্ধতিরও উদ্ভাবন হয়েছে।৬ এই সময়ের সংহতকরণ, আন্তঃআঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ, (কখনও কখনও) কেন্দ্রীভূতকরণ চরিত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদী এবং ঔপনিবেশিক বিজ্ঞানের মডেলগুলোর অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য (The accumulative, transregional, and (sometimes) centralizing features highlighted as characteristic of the period are also integral to many models of imperial and colonial science.)।৭

এই বিস্তৃত পাণ্ডিত্য-ছাতা তৈরি আর বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে তথ্য আর নমুনা বিশ্বজুড়ে চলাচল করেছে। দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হলেও, সাম্রাজ্যবাদী ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তথ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সাথে তাল মিলিয়ে নতুন জ্ঞান অনুশীলনের আবির্ভাবও ঘটেছে।৮ এই প্রবন্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান কীভাবে এই পরিবর্তনকে রূপ দিয়েছিল, অংশ নিয়েছিল তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরব। বৈজ্ঞানিক নমুনা আর তথ্য সঞ্চয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে বুঝতে চেষ্টা করব সে সময়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ভূকর্মকাণ্ডে সাথে বিজ্ঞান কীভাবে জড়িয়ে ছিল।9

প্রথম অংশে জেসিকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বৃহত্তর উন্নয়নের প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশে তিনি দেখেছেন নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি, জাদুঘরের স্টোরের ইতিহাসে কিভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াকমার চিহ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয় অংশে দেখেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নমুনা সংগ্রহ কিভাবে ব্রিটেনে বিজ্ঞানচর্চায় প্রভাব ফেলেছে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের নমুনা সংগ্রহ-ভিত্তিক জুওলজিক্যাল সোসাইটি, জিওলজিক্যাল সোসাইটির মত বৈজ্ঞানিক সমিতির সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়েও আলোকপাত করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বৈজ্ঞানিক নমুনা সঞ্চয়ের ফলে তথ্য উদ্বৃত্ত ব্রিটেন ইউরোপজুড়ে নমুনা সংগ্রহ এবং প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সহায়তা করলেও উপনিবেশে নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়েছে। তৃতীয় বিভাগে তিনি কোম্পানির জাদুঘরের সঙ্গে কোম্পানির শাসন অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলায় নমুনা সংগ্রহ নিয়েও নজরদারি করেছেন।

১।

ইস্ট ইন্ডিয়া হাউসে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা – কোম্পানির বিজ্ঞানচর্চা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন

রাজার সনদে ১৬০০য় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকে তার চরিত্র ছিল quasi-independent state body। আঠের শতকের শুরু থেকে সেনাবাহিনী তৈরি করে, ১৭৬০এর দশকে বাংলায় প্রশাসনিক অধিকার কায়েম করবে। এরপরে আরও এক শতকজুড়ে সে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে বিপুল রাজস্ব এবং বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মেট্রোপলিটনে নিয়ে যাবে, যে আকাশ ছোঁয়া লুঠ সম্পদ পুঁজিতে পরিণত করে ইওরোপের বহু দেশে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা করবে। ১৭৯০এর মাঝামাঝি এসে, বাংলার বিশাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনার ৫ দশকের মাথায় তার হঠাৎ মনে হল মেট্রো লন্ডনে আকর্ষণীয় পদচিহ্ন নির্মাণ করা দরকার। ১৬৪০-এর দশক থেকে কোম্পানি, রয়্যাল এক্সচেঞ্জ এবং লন্ডনের আর্থিক কেন্দ্র থেকে অল্প হাঁটা দূরত্বে লিডেনহল স্ট্রিটে কয়েকটি বাড়িতে প্রশাসনিককর্ম চলত। ইন্ডিয়া হাউস নামে পরিচিত কোম্পানির অফিসগুলোর মধ্যে, কোর্ট অব কমিটির (বা কোর্ট অফ ডিরেক্টরস) কাজকর্মের পদ্ধতি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৬৬৯-তে কোসিমো তৃতীয় ডি মেডিসি-র (Cosimo III de Medici) ইংল্যান্ড সফরে ইন্ডিয়া হাউসে এক বিকেলের অভিজ্ঞতা, ” প্রাণী এবং উদ্ভিজ্জ উভয় ধরণের কৌতূহলী দ্রব্য… জনসাধারণের কৌতূহল মেটানোর জন্য এখানে রাখা হয়েছিল (which is full of curious things both animal and vegetable . . . kept here to gratifie the curiosity of the public)। রবার্ট বয়েল লিখছেন, ইন্ডিয়া হাউস “আমার কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্য” এক বিশাল অকাটা হীরার স্তূপ হাত বোলাবার অনুমতি দিয়েছিল।১১ ১৭৯০-এর দশকে, কোর্ট অফ ডিরেক্টরস নতুন ইন্ডিয়া হাউসের দর্শনীয় কাঠামো নকশা তৈরি করে কোম্পানির ক্রমবর্ধমান আমলাতন্ত্র নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যম নেয়, যার একটা অংশে থাকবে বাড়তে থাকা “প্রাচ্য সংগ্রহস্থল”-এর জন্য স্থায়ী স্থানের অস্পষ্ট পরিকল্পনা। কোম্পানির প্রথম অফিসিয়াল ইতিহাসবিদ রবার্ট ওরমে নতুন অফিসে একটি বড় লাইব্রেরি তৈরির ইচ্ছে জানিয়েছিলেন। নতুন পরিকল্পনায় সব কিছুকেই এক ছাদের তলায় আনার পরিকল্পনা করা হল। কোম্পানির কর্মচারী এবং সংস্কৃত পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত চার্লস উইলকিন্স (১৭৪৯-১৮৩৬) একটি খসড়া প্রস্তাব দিলেন। উইলকিন্স ১৭৭০ থেকে ১৭৮৬-এ বাংলায় করণিক, অনুবাদক এবং মুদ্রাকর ছিলেন। উইলিয়াম জোন্সের সাথে ১৭৮৪-এ এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল-এর প্রতিষ্ঠাতা। লন্ডনে ফিরে, উইলকিন্স এশিয়াটিক সোসাইটির থেকেও উন্নত এক কাঠামো তৈরির ভাবনা ভাবছিলেন (এর সদস্যরা স্পষ্টতই লন্ডনের রয়েল সোসাইটিকে অনুসরণ করতেন)। উইলকিন্স, তার একদা পৃষ্ঠপোষক প্রাক্তন গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের মাধ্যমে “ইন্ডিয়া হাউসে প্রস্তাবিত প্রাচ্য জাদুঘরের একটি পরিকল্পনার স্কেচ” (A Sketch of a Plan for an Oriental Museum proposed to be established at the India House) কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর জমা দিয়েলেন১২ তাতে ছিল “মানচিত্র, চার্ট, পরিকল্পনা, দৃষ্টিভঙ্গি, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রিত বই, মুদ্রা, পদক, মূর্তি এবং শিলালিপি”-র এক মহাফেজখানার প্রস্তাব। ছিল “প্রাকৃতিক বস্তু,” “কৃত্রিম বস্তু” এবং “বিবিধ বস্তু”-নামে তিনটে ক্যাবিনেট ( “natural productions,” “artificial productions,”, “miscellaneous articles”) – যে নাম ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে দেখি। প্রাকৃতিক বস্তু বোঝাতে উইলকিন্স প্রাণীজ, উদ্ভিজ্জ এবং খনিজ নমুনা সংগ্রহের প্রস্তাব করেছিলেন, যা “বাণিজ্য বস্তু”ও হতে পারে। আমাদের মনে হয় এই বিভাগে প্রায় সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত ছিল (This, importantly, would seem to have included just about everything)। দাঁত, পশম, রেশম পোকা থেকে শুরু করে পাখির ভোজ্য বাসা, আখ থেকে শুরু করে কোচিনিয়াল (পতঙ্গ) এবং নীল থেকে শুরু করে বোম্বে ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম এবং জীবাশ্ম ইত্যাদির বিস্তৃত তালিকা দিলেন। প্রতিটি নমুনার সাথে “তার প্রাকৃতিক ইতিহাসের সারসংক্ষেপ” থাকার-ও প্রস্তাব দিলেন। কৃত্রিম বস্তুর মধ্যে ছিল “এশিয়ার সমস্ত উৎপাদনের নমুনা … বিভিন্ন মেশিন এবং সরঞ্জামের মডেল …এবং পশুপালনের সরঞ্জাম এবং তাদের বিজ্ঞানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, গাণিতিক, জ্যোতির্বিদ্যা, সঙ্গীত ইত্যাদি (samples of all the manufactures of Asia . . . Models of various machines and tools . . . and also implements of husbandry, and instruments used in their sciences, mathematical, astronomical, musical, etc. etc)।” বললেন যে বস্তু “কেবল” কৌতূহলী দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং “এমন জিনিস যা পূর্ববর্তী কোনও শিরোনামের অধীনে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না”, সে সবও প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয় বরং তৃতীয় ক্যাবিনেট – বিবিধতে জুড়ে দেওয়া উচিত। উইলকিন্সের স্কেচে একটি মুদ্রণ দপ্তরের প্রস্তাব ছিল যেখানে “বিদেশী” (অ-ল্যাটিন) টাইপফেস তৈরি এবং কলকাতায় বর্তমানে যেভাবে সমিতি বিকশিত হচ্ছে তার সমান্তরাল সমিতি গঠনের উল্লেখ ছিল।13

উইলকিন্সের বর্ণনায় কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের তৈরি এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল প্রতিষ্ঠার সময়ের আলোচনার ছাপ পাচ্ছি। উইলিয়াম জোন্স, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম কয়েকটা বার্ষিক ভাষণে, এশিয়ার “প্রাকৃতিক” এবং “কৃত্রিম” উভয় ধরণের দ্রব্য সংগ্রহের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর প্রস্তাবে “শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা”ই ছিল চালিকা শক্তি, উইলকিন্সের প্রস্তাবে তা ছিল না। জোন্স বললেন বিজ্ঞান এবং শিল্প সাধনা বাণিজ্য সাধনার সাথে হাত মিলিয়ে চলুক – The civil history of their vast empires, and of India in particular, must be highly interesting to [British rulers]; but we have a still nearer interest in knowing all former modes of ruling these inestimable provinces, on the prosperity of which so much of our national welfare, and individual benefit, seems to depend. A minute geographical knowledge, not only of Bengal and Bahar [Bihar], but, for evident reasons, of all the kingdoms bordering on them, is closely connected with an account of their many revolutions: but the natural productions of these territories, especially in the vegetable and mineral systems, are momentous objects of research to an imperial, but, which is a character of equal dignity, a commercial, people.14 (তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের এবং বিশেষ করে ভারতের নাগরিক ইতিহাস [ব্রিটিশ শাসকদের] কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে হবে; কিন্তু এই অমূল্য প্রদেশগুলির শাসনের সমস্ত পূর্ববর্তী পদ্ধতিগুলি জানার ক্ষেত্রে আমাদের আরও আগ্রহ রয়েছে, যার সমৃদ্ধির উপর আমাদের জাতীয় কল্যাণ এবং ব্যক্তিগত সুবিধার অনেকটাই নির্ভর করে বলে মনে হয়। কেবল বাংলা এবং বাহার [বিহার] নয়, স্পষ্টতই, তাদের সীমান্তবর্তী সমস্ত রাজ্যের একটি ক্ষুদ্র ভৌগোলিক জ্ঞান তাদের বহু বিপ্লবের বিবরণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত: তবে এই অঞ্চলগুলির প্রাকৃতিক উৎপাদন, বিশেষ করে উদ্ভিদ এবং খনিজ ব্যবস্থায়, একজন সাম্রাজ্যবাদী, কিন্তু, যা সমান মর্যাদার চরিত্র, একটি বাণিজ্যিক, জনগণের কাছে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়)।14

উইলকিন্সের মতো, জোন্সও শিক্ষার সঙ্গে “বাণিজ্য স্বার্থ” দেখলেন।

বাংলার গভর্নর-জেনারেল হেস্টিংসের পৃষ্ঠপোষকতা নবজাত এশিয়াটিক সোসাইটি পায়নি, যদিও কোম্পানির সভা কক্ষে সমিতি সভা আয়োজনের অনুমতি দিয়েছিলেন। লন্ডনে ফিরে, হেস্টিংস এই ধরনের সংগঠনকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তাঁবেতে নিয়ে আসতে উৎসাহ দেখান। “কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণে ভারতীয় জ্ঞানকে আমল দেওয়ার নতুন এবং অপ্রচলিত ব্যবস্থা তৈরির” আহ্বান জানিয়ে কোর্ট অব ডিরেক্টরসকে চিঠি লেখেন। জোন্স আর উইলকিন্সের প্রাচ্যবাদী তত্ত্বে হেস্টিংসও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় জ্ঞান উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিলেন। যেখানে অন্য বাণিজ্য সংগঠন (“men associated for the purposes of pecuniary gain) সাধারণত “সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি”-তে শুধুই মুনাফায় নজর দেয়, সেখানে কোর্ট অব ডিরেক্টরস-এর জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার তৈরির পরিকল্পনা ব্যতিক্রমী ছিল। হেস্টিংস বলেছেন – লক্ষ্য করুন তিনি কিন্তু ব্যবসার ভাষা ব্যবহার করলেন – কোম্পানি joined a desire to add the acquisition of knowledge (and wonderful will be the stores which the projected institution under such auspices will lay open to them) to the power, the riches, and the glory which its acts have already so largely contributed to the British Empire and Name। লিডেনহল স্ট্রিটে নতুন দপ্তর-প্রাসাদ তৈরি হওয়ার পরে (চিত্র১), উইলকিন্স কিউরেটর এবং গ্রন্থাগারিক হলেন। এবার কোর্ট অফ ডিরেক্টরস পাবলিক ডিসপ্যাচে (একটি কোম্পানিজোড়া নির্দেশ) “প্রাচ্য জাদুঘর তৈরির উদ্দেশ্যে প্রাসাদ বরাদ্দ”-এর ঘোষণা প্রচারিত হয় এবং বিদেশে কর্মরত কর্মচারীদের নির্দেশ পাঠানোর নির্দেশ জারি করে।

ইমপিচমেন্টের অভিযোগ থেকে খালাস পেয়ে হেস্টিংস জাদুঘর পরিকল্পনার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। হেস্টিংসের শাসনকালে বাংলায় কোম্পানি আমলাদের দুর্ণীতি নিয়ে পার্লামেন্টে বিচারের ঘনঘটা মেট্রোপলিটনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুনামে ধাক্কা লেগেছে, এরকম একটা ধারণা ছড়িয়ে গিয়েছিল কোম্পানির বোর্ড রুমের সদস্যদের মধ্যে।১৬ এই বিশেষ সময়ে দেশীয় রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে, হেস্টিংস এবং পরিচালনা পর্ষদ উভয়েই মনে হল জাদুঘর এবং গ্রন্থাগারের মতো অ-ব্যবসায়িক প্রকল্প রূপায়ন করা কোম্পানির ভূলুণ্ঠিত ভাবমূর্তি উদ্ধারে সহায়ক হবে।

তবুও মাথায় রাখা দরকার নতুন জাদুঘর তৈরি পরিকল্পনা কোম্পানির একার ছিল না। কোম্পানির লন্ডন মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা আদতে কোম্পানি সাম্রাজ্যের চরম কেন্দ্রীকরণ উদ্যম, বিশ্বসমাজজুড়ে তথ্য সংগ্রহের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। মাথায় রাখা দরকার শুধুই কোম্পানি কর্মচারীদের সংগ্রহ করা নমুনা দিয়ে লন্ডনে এই ধরণের সরকারী ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। সমুদ্রবাণিজ্যের প্রথম যুগ থেকেই ব্রিটিশ কোম্পানির কর্মকর্তা – রয়েল আর্মি এবং নৌবাহিনীতে তাদের সমকক্ষদের মতো – বিদেশ থেকে সংগ্রহযোগ্য দ্রব্যের নমুনা জোগাড়ের একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ তৈরি করেছিল। কোম্পানি জানত কর্মচারীরা কোম্পানির ব্যবসা দেখার পাশাপাশি ছোট আকারের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে জন্য লালায়িত হবে। আমলাদের ছোট ব্যবসায় বড় লাভের হাতছানি সফল করাতে কোম্পানি জাহাজে সীমিত সংখ্যক পণ্যসম্ভার লন্ডনে পাঠানোর কৌশলী অনুমোদন ছিল। ততদিনে মেট্রোপলিটনে বিদেশী শিল্পকর্ম, আশ্চর্য সব পণ্যসম্ভার আর প্রাকৃতিক ইতিহাসের নমুনা সংগ্রহের বাণিজ্যিক বাজার তৈরি হয়েছিল বলেই কোম্পানি কর্মচারীরা সম্ভবত এই খাতে লাভের চেষ্টা করছিলেন। ভারতে কাজ করা ইউরোপীয়দের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত অর্থের বেশিরভাগই পরিবারেই থাকত।17

লন্ডনে জাদুঘর repository প্রতিষ্ঠার ফলে কোম্পানির material accumulation পরিকল্পনায় দু’ধরণের পরিবর্তন এল। প্রথমত, ব্যক্তিগত উদ্যমে দীর্ঘকাল ধরে চলা কর্মীদের অনানুষ্ঠানিক নমুনা সংগ্রহের উদ্যমে কোর্ট অফ ডিরেক্টরস হস্তক্ষেপ করে নিয়ন্ত্রণে উদ্যমী হলেন – উরসুলা ক্লেইন-এর ভাষায় নমুনা সংগ্রহকরণের উদ্যম ব্যক্তিত্বহীন depersonalizing হল।18 দ্বিতীয়ত, এই কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের ফলে নমুনা সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া (এবং অবশেষে তথ্য-তত্ত্ব উৎপাদনও) কেন্দ্রীভূত হল। পরিচালকদের দৃষ্টিকোণে এই দুটি বিষয়ই সাম্রাজ্য প্রশাসনের কেন্দ্রীয় সমস্যা – বিদেশে ভৌগোলিক দূরত্বে আপেক্ষিক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তা এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে এনে সুষ্ঠু পরিচালন ব্যবস্থা তৈরি করা। এই উদ্যমের অন্যতম চলক ছিল তথ্য অ্যাক্সেস/প্রাপ্তি আর নিয়ন্ত্রণ।19 উনিশ শতকের গোড়ায় কোম্পানি পরিচালকরা যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃত পরিসর কেন্দ্রীভূত করার নতুন উপায় খুঁজছিলেন। এই উপায়ের অন্যতম ম্যানিফেস্টেশন ছিল ১৮০৬-এ হার্টফোর্ডশায়ারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলাদের প্রশিক্ষণ কলেজের প্রতিষ্ঠা, যা পরে হেলিবেরি কলেজে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ কোম্পানির লাইব্রেরি এবং জাদুঘর তৈরি সঙ্গে সমান্তরাল আমলা প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা হল তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্যে। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৮০০য় তৈরি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গ্লোরিকে এই সব প্রতিষ্ঠান ছাপিয়ে যাবে। মাথায় রাখতে হবে হার্টফোর্ডশায়ার কলেজ খোলার আগে, আমলা তৈরির প্রশিক্ষণ কেবল কলকাতাতেই ছিল। ১৮১০-এর মধ্যে আমলা প্রশিক্ষণ ব্রিটেনে ফিরিয়ে এনে করণিকদের ফার্সি, বাংলা এবং উপমহাদেশের অন্য ভাষায় মৌলিক দক্ষতা তৈরি করানো হবে।

বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভূতকরণ এবং তার বিজ্ঞানের উপাদান হয়ে সঞ্চিত হওয়ার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। ব্রিটেনের আধুনিক আমলাতন্ত্রের বিকাশকে রাজনৈতিক ইতিহাসবিদরা ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বাড়তে থাকা “স্থানীয় অঞ্চল থেকে কেন্দ্রে তথ্য প্রবাহ”, “জ্ঞানের কেন্দ্রীকরণ”, একই সাথে “রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতা পুনর্গঠন” হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। ডেভিড ইস্টউড লিখছেন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাষ্ট্রের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান তথ্য প্রবাহ – তথ্য দখলে রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য নানা নতুন উপায় ছিল “আঠারো-ত্রিশের দশকে উদ্ভূত দর্শনীয় প্রবণতা”।20 এই সময়ে, প্রোটো-টেকনোক্র্যাটরা, জন আগরের ভাষায় রাষ্ট্রকে “তথ্যায়ন”-এর দিকে ঠেলে দিতে থাকে। ব্রিটিশ উপনিবেশে দ্রুত বাড়তে থাকা আমলাতন্ত্র সংগঠিত তথ্য সংগ্রহের নতুন উপায় – জরিপ, আদমশুমারি, ফর্ম – এতটাই উৎসাহের সাথে রূপায়িত-প্রচারিত করতে থাকে যে সাম্রাজ্য মহাফেজখানা সম্পূর্ণ নতুন মর্যাদা মণ্ডিত হয়ে নতুন ধরণের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এবং শাসনের নতুন পদ্ধতি বিশেষভাবে আলোকিত প্রকল্প হিসেবে ন্যায্যতা লাভ করবে।21

রাজনৈতিক দার্শনিক, আজীবন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলা জন স্টুয়ার্ট মিল, ১৮৬১-তে কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র এবং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে উন্নয়নের রাস্তা হিসেবে দেখলেন। মিল বললেন এই ব্যবস্থা দুটো পদ্ধতিতে উন্নত শাসনব্যবস্থার দিকে পরিচালিত হবে: জ্ঞান গঠনের জন্য তথ্যের কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার তৈরি প্রয়োজন যার ভিত্তিতে উত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে; কেন্দ্রীয় দপ্তরে নিযুক্ত আমলা প্রাদেশিক প্রশাসনে কাজ করা কর্মীদের তুলনায়, ‘ব্যক্তিগতভাবে শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে গণ্য হবেন। প্রশাসনিক বৃত্তের প্রান্তকর্মীর দায় হল কেন্দ্র গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা – তিনি বললেন ক্ষমতার আঞ্চলিকিকরণ হোক, কিন্তু জ্ঞান যেহেতু সবচেয়ে দরকারী, তার কেন্দ্রীভবন বাধ্যতামূলক; Power may be localized, but knowledge, to be most useful, must be centralized.”22 (জন স্টুয়ার্ট মিল, কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট (1861)) (শের শাহের কাছে হুমায়ুনের বিব্রত হওয়ার সময়, ভায়েরা হুমায়ুনকে উদ্ধারে রিলাক্ট্যান্ট থেকেছেন। এই অভিজ্ঞতায় আকবর সুবায় শাসন করতে যাওয়া শাহজাদা, খানজাদা সাউবাদারদের স্বাধীন প্রশাসন পরিচালনার অধিকার কেড়ে নিলেন। যেহেতু উপনিবেশপূর্ব সময়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল, এবং রাষ্ট্রের কালচারাল, আর্থিক, সামাজিক এজেন্ডা ছিল না, তাই এই সিদ্ধান্ত শুধুই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ওয়েলেসলি, মেকলে, মিলের সিদ্ধান্ত সুদূর প্রসারী হল।)

কোম্পানির জাদুঘর উদ্যমের ভক্ত মিল, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার ভূমিকার পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। কিউ গার্ডেনের জোসেফ হুকার, অ্যাডমিরালটি হাইড্রোগ্রাফিক অফিসের ফ্রান্সিস বিউফোর্ট, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিচার্ড ওয়েন, অথবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিউরেটর থমাস হর্সফিল্ড – বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য দক্ষতা এবং তথ্যের কেন্দ্রীভূত ভাণ্ডার তৈরির গুরুত্বের পক্ষে দাঁড়ানোয় মিলের তত্ত্ব দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হল।23

মেটিয়িয়াল কালচারের পলিটিক্যাল ইকনমি – বাড়তে থাকা নমুনা সংগ্রহ

কোর্ট ডিরেক্টরদের নির্দেশে কর্মচারীরা বিনামূল্যে নমুনা জোগাড় করার প্রক্রিয়া চালু থাকলেও জাদুঘর তৈরির মূল সংগ্রহ কিন্তু এসেছে উপনিবেশের সামরিক অভিযানে “সরকারি” লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায়। জাদুঘরের প্রথম সময়ের বড় নমুনা এসেছিল শেষ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধে ১৭৯৯-এ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারাজা টিপু সুলতানকে হারিয়ে মহীশূর রাজ্য দখল করে টিপুর প্রাসাদের পাণ্ডুলিপি, শিল্পকর্ম, ধনসম্পদ, আশ্চর্য সব দ্রব্য লুঠ করে। ১৮২০-এর দশকের লন্ডন গাইড বলছে কোম্পানি জাদুঘর ভ্রমণকারীদের জনপ্রিয়তম আকর্ষণ ছিল; মিউজিয়ামে সবচেয়ে বেশি ভিড় হত অস্ত্র, বর্ম, সিংহাসন এবং রত্নপাথর প্রদর্শনীতে। টিপুর বাঘ, অটোমেটন জনপ্রিয় প্রদর্শন বস্তু ছিল।24

যুদ্ধের লুঠ বা কূটনৈতিক-চাপ তৈরির ধাক্কায় জোগাড় করা নমুনার পাশাপাশি প্রদর্শিত হত আরেক ধরণের লুঠ – এশিয়ার প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম জগতের সংরক্ষণাগার। এক শোকেস রঙিন স্টাফড ফ্লেমিংগো, আইবিস, হেরন এবং ঈগল ভর্তি ছিল। অন্য দেয়ালে জারে সংরক্ষিত ছিল সাপ টিকটিকি (একটি “সাপ-টিকটিকি”)।25 আরও এক ডজন শোকেসে প্রাকৃতিক ইতিহাসের নমুনা প্রদর্শিত হয়েছে। আমরা যেন ভুলে না যাই ১৮২০-র মধ্যেই প্রাকৃতিক ইতিহাস সংগ্রহ কোম্পানির রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে থাকবে। এই সময়ে লিডেনহল স্ট্রিটের ভাণ্ডারে নমুনা যোগ হওয়ার একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন হল – কোম্পানির জ্ঞান এবং ধারণা নতুন এলাকায় পরীক্ষা করার প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা প্রচুর নমুনা ক্রেটে প্যাক করে মেট্রোপলিটনে পাঠানো।26

নেপোলিয়নের পরাজয় এবং ১৮৫৮য় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলোপের মধ্যেকার সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় কোম্পানির নতুন ধরণের শাসনতন্ত্র বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনে সাম্রাজ্য বাড়ানোর উদ্যম নেয়। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের সঙ্গে প্রায় মুখোমুখি টক্কর লাগে যেমন মধ্য এশিয়ায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী রুশ সাম্রাজ্য, উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে শিখ সাম্রাজ্য ইত্যাদি। এছাড়াও ক্রমশ ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্য থেকে শাসক কোম্পানি সরে যেতে বাধ্য হয়; কোম্পানির কর্মকর্তাদের মনে হচ্ছিল ভারত এবং পূর্ব অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নতুন বাণিজ্য সংযোগ গড়ে তোলাই পুঁজি সংহত হওয়ার প্রকৃষ্ট উপায়।

ভূতত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রথম সংগ্রহের বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোম্পানির রাজনৈতিক সম্প্রসারনের ফল। ১৮১১ পর্যন্ত মালয় দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটিশ উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, রয়েল নেভি যৌথভাবে ডাচ জাভা আক্রমণ করে। নেদারল্যান্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের সাথে জোট তৈরি করার পর ব্রিটিশরা যে কয়েকটি ডাচ উপনিবেশ দখল করেছিল, জাভা তার মধ্যে অন্যতম। ফরাসিরা হেরে গেলে এই অঞ্চল ডাচদের ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। উইলিয়াম ফারকুহর এবং থমাস স্ট্যামফোর্ড র‍্যাফেলসের মতো স্থানীয় কোম্পানি প্রশাসক লন্ডনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংসদকে ব্রিটিশদের হাতে অর্জিত সম্পত্তির কিছু অংশ রাখার জন্য চাপ দিলেন। সেই সময়ে, ব্রিটেন এই অঞ্চল সম্পর্কে খুব কিছুই জানত না। র‍্যাফেলস ১৮১৩ থেকে ১৮১৯-এর মধ্যে অঞ্চল জরিপ এবং তথ্য সংগ্রহ করেন, তাতে জাভার লেফটেন্যান্ট-গভর্নরের দপ্তরের নমুনা সম্পদ ব্যবহার হয়েছে। সব থেকে বড় নমুনা পাওয়া গেল টমাস হর্সফিল্ড, বাটাভিয়াস জেনুটসচ্যাপ ভ্যান কুনস্টেন এন ওয়েটেনশ্যাপেনের (১৭৭৮-এ প্রতিষ্ঠিত বাটাভিয়ান সোসাইটি ফর আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস) বিশাল সংগ্রহ লুঠে। হর্সফিল্ড ছিলেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমেরিকান ডাক্তার। ১৮০১ থেকে বাটাভিয়ায় (জাকার্তা) থাকতেন।২৭

এই উথালপাথাল সময়ে, ডাচরা বেশিরভাগ মহাফেজখানা তো হারালই; সবচেয়ে ক্ষতি হল তাদের সক্রিয় সংগ্রাহকদের মধ্যে একজনকে হারানোয়। দ্বীপের ব্রিটিশ জরিপ শুরু করার প্রক্রিয়ায়, মাদ্রাজের তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল লেফটেন্যান্ট কর্নেল কলিন ম্যাকেঞ্জি, পূর্ববর্তী সরকারের মানচিত্র, পরিকল্পনা, চার্ট এবং জরিপ সংগ্রহ করেছিলেন – সবকটাই লন্ডনে পৌঁছল। ইতিমধ্যে, জাভার লেফটেন্যান্ট-গভর্নর র‍্যাফেলস, হর্সফিল্ডের সাথে বন্ধুত্ব করে তার পৃষ্ঠপোষক হলেন।

১৮১২ থেকে, হর্সফিল্ড কোম্পানির জাদুঘরের জন্য নমুনা সংগ্রহ শুরু করলেন। নমুনাগুলো ক্রেটে বন্ধ করে নিয়মিত লন্ডনে পাঠানো হয়েছে; একই সময়ে র‍্যাফেলসের অনুমতি নিয়ে, হর্সফিল্ড জোসেফ ব্যাঙ্কসের জন্যও নমুনা সংগ্রহ করতেন। ১৮১৫-য় নেপোলিয়ন পরাজিত হলে, চুক্তি অনুযায়ী জাভা ডাচদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। সংগ্রহের মালিকানার প্রশ্ন জটিল হয়ে পেকে ওঠার আগেই র‍্যাফেলস, হর্সফিল্ড পুরো সংগ্রহ লন্ডনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেন। হর্সফিল্ড বেতন অগ্রিমের বিনিময়ে, ডাচ সংগ্রহের গোটাটাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিক্রি করেন।২৮ ১৮১৯-তে এই সংগ্রহের শেষটুকু লন্ডনে পাঠিয়ে জাদুঘরের চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রকাশনার কাজ শুরু করে (চিত্র ২) ১৮৩৬-এ উইলকিন্সের মৃত্যু হলে কোম্পানির জাদুঘরের পরিচালক হলেন।

হর্সফিলফডের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে (গ্রন্থাগারিকের পদ অক্সফোর্ডের সংস্কৃত অধ্যাপক হোরেস হেইম্যান উইলসনকে দেওয়া হল), জাদুঘরের বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ত্বরান্বিত হয়। সাম্রাজ্যজুড়ে কোম্পানির কর্মচারীদের নমুনা অনুদানের পাশাপাশি, ১৮৩০ এবং ১৮৪০-এর দশকে প্রথম আফিম যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪২), প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪২), অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধ (১৮৪৫-১৮৪৯), এবং আবিসিনিয়া, তিব্বত, নেপাল এবং ভুটানের কূটনৈতিক মিশনগুলির প্রেক্ষাপটে বিপুল পরিমান সংগ্রহ জুড়ল। ব্রিটিশ ভারতে গঙ্গা বদ্বীপে একটি বিশাল নতুন কৃষি খাল ব্যবস্থা নির্মাণের সময় জাদুঘর প্রচুর পরিমাণে ভূতাত্ত্বিক, জীবাশ্মবিদ্যা এবং উদ্ভিদবিদ্যার নমুনা পেল।

১৮৪০-র মধ্যে অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের জাদুঘর থেকে নির্দিষ্ট নির্দেশাবলী পাঠানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। যেমন Tibetan Boundary Commission-কে লেখা স্মারকলিপিতে “এই মিশনের বৈজ্ঞানিক বিভাগের কর্মের প্রতি সরকার যাতে গুরুত্ব দেয়” সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয় এবং “এই বাড়িতে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়” তালিকাভুক্ত করা হয়; স্মারকলিপিতে কয়েক ডজন স্তন্যপায়ী প্রাণী সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হল। নতুন অঞ্চলে অনুসন্ধানের ফলে পাওয়া সংগ্রহ বিশেষ মূল্যবান ছিল। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর (অথবা, সম্ভবত, চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে জাদুঘরের কর্মীরা) নির্দেশে বিভিন্ন বন্দরে এই ধরনের সংগ্রহের উপর নিবিড় নজর রাখা হয়েচভহে – উল্লেখ করা যাক লন্ডনে আসা নমুনার একাংশ উপনিবেশে চলে গিয়েছে।৩০

ঊনবিংশ শতের শুরুতেই কোম্পানির জাদুঘরে নমুনা আসার ধরণ কোম্পানির বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাবলীর সাথে যুক্ত। পণ্ডিতেরা উনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানচর্চা ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তথ্য মহাফেজখানার সম্প্রসারণকে মূলত ইউরোপের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছেন। সুসান ফে ক্যানন বলছেন, প্রুশিয়ান প্রকৃতিবিদ আলেকজান্ডার ভন হাম্বোল্টের অনন্য ক্যারিশম্যাটিক শক্তি এবং তার আউটপুটের ওপর ভিত্তি করে এই সময়ের অভিজ্ঞতামূলক, তথ্য-নিবিড় (“হাম্বোল্ডটিয়ান”) বিজ্ঞানের উল্লম্ফন ঘটে Susan Faye Cannon, for example, points to the Prussian naturalist Alexander von Humboldt’s unique charismatic force and his prolific output as an explanation for why empirical, data-intensive (“Humboldtian”) sciences took off with such force in this period । মাইকেল ডেটেলবাখের যুক্তি হামবোল্টের নিজস্ব পদ্ধতি অ্যান্টোইন-লরেন্ট ল্যাভোয়াসিয়ারের পদ্ধতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল এবং ফলস্বরূপ তিনি জন হার্শেল, উইলিয়াম হুইওয়েল, চার্লস ডারউইন, মেরি সোমারভিল এবং আরও অনেকের মডেল হলেন। জিম এন্ডারসবি, কিউ গার্ডেনের নমুনা সংগ্রহের বৃদ্ধিতে জোসেফ হুকারের ব্যক্তিগত প্রভাব উল্লেখ করেন। হামবোল্টের উদাহরণ বা বিজ্ঞানের মেট্রোপলিটন ব্যক্তিদের কাজকর্মে ব্রিটেনে তথ্য সংগ্রহের প্রসার ঘটে। ক্যানন বলেছেন, “বিভিন্ন ক্ষেত্রের বৈজ্ঞানিক মুখপাত্ররা আরও বেশ তথ্য জোগাড়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিল।”31

কিন্তু এই ধরনের বিশ্লেষণ দিয়ে লন্ডনে কীভাবে এবং কেন বিপুল পরিমান তথ্য আসছিল সেই বিষোয়টা প্রতিষ্ঠা করার সমস্যা। “আরও তথ্য চাওয়া”-র ফলে তথ্য সংগ্রহের বাড় বৃদ্ধি ঘটার “বৈজ্ঞানিক মুখপাত্রদের” ছবি আদতে ১৮৩০ এবং ১৮৪০-এর দশকের ম্যাগনেটিক ক্রুসেডের উদাহরণের সাথে খাপ খায়, যেখানে ফ্রাঁসোয়া আরাগো এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স (BAAS) পৃথিবীর চৌম্বকত্ব খোঁজার নতুন বিশ্বব্যাপী জরিপের উদ্যম নিচ্ছিলেন। এর সঙ্গে ১৮৩০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে জোয়ার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের উইলিয়াম হুইয়েলের আহ্বানের প্রেক্ষাপটও জুড়তে পারে।৩২ কিন্তু জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য অথবা কোম্পানির সার্জনদের সামরিক অভিযানে পাঠানোর জন্য কোর্ট অব ডিরেক্টর্স-এর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছার প্রভাবকে কোন দৃষ্টিতে দেখব? ৩৩ উত্তর অবশ্যই নির্ভর করছে, আমরা বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় scientific community বলতে কি বুঝি সেই সংজ্ঞার উপর; কিন্তু সমস্যা হল, এই সময়ে এই সীমানা নিজেই তীব্র বিতর্কের অংশ ছিল। চার্লস ব্যাবেজের সমসাময়িকরা যা কিছু দাবি করুন না কেন, ব্রিটেনের বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি বলতে কোম্পানি প্রশাসক, কর্মকর্তা এবং উপনিবেশে ব্যক্তিগত ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বোঝানোর পাশাপাশি রয়েল সোসাইটি বা BAAS-এর মেট্রোপলিটন সদস্যদের বোঝাত। কোম্পানির বিপুল নমুনা সংগ্রহ – মহাফেজখানার আকার আর পরিধি, নির্দিষ্ট কোনও বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের গবেষণার চাহিদা বা আগ্রহ নির্ভর করে গড়ে ওঠে নি বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে, বিশেষ করে কোম্পানির কোথাও দখলদারি, কোথাও আকস্মিক সরে আসার ঘটনা (নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময়ের লুঠ-সংগ্রহ) মত বিষয়কে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত করার ফলে ঘটেছে। এই বিষয়টা বুঝতে, আমাদের জন ব্যারো, জোসেফ ব্যাংকস বা উইলিয়াম হার্শেলের মতো ক্ষমতাবান বিজ্ঞানী-আমলাদের প্রভাবের বাইরে বেরিয়ে দেখতে হবে।  

মেটিরিয়াল কালচার আর বৈজ্ঞানিক প্রথা –

কোম্পানির জাদুঘর আর বৈজ্ঞানিক সমিতির বিকাশ ১৮৩০, ১৮৪০ এবং ১৮৫০ এর দশকজুড়ে লিডেনহল স্ট্রিটের আরও আরও ঘর নমুনা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে (চিত্র ৫ দেখুন)। কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন – যেমন ১৮১৮-য় ভারত বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার হারানো, ১৮৩৩-এ চীন বাণিজ্য ক্ষতির ফলে খালি হয়ে যাওয়া্ ঘরগুলোর কিছু অংশে প্রদর্শনী প্রসারিত হল।

হর্সফিল্ডের সাফল্য ছিল প্রাকৃতিক ইতিহাস প্রদর্শন কক্ষের সম্প্রসারণ। তিন তলায় জরিপ অফিস জায়গা দখল করলেন তিনি। ১৮৪৫-য় প্রথম তলার বেতন দপ্তরও প্রদর্শনীর জন্য নেওয়া হল – এতে হিউ ফ্যালকনার এবং প্রোবি কটলির সংগ্রহ করা শিবালিক পাহাড়ের জীবাশ্ম ঠাঁই পেল। ১৮৫৫-তে বাগদাদ থেকে আসা দুটো বিশাল অ্যাসিরিয় রিলিফ এতই ভারি ছিল যে নীচতলার খালি হয়ে যাওয়া চা নিলাম ঘর ছাড়া অন্য কোথাও রাখা গেল না। লাইব্রেরিতে মডেল, কারুশিল্প, শিলালিপি এবং মুদ্রার প্রদর্শনী এল। করিডোর আর সিঁড়িতে সারি দিয়ে শিল্পকর্ম রাখা ছিল। ১৮৫৬-য় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর সিরিজ থেকে প্রায় ৬,০০০ বর্গফুট প্রদর্শনী ফিরে আসার পর, দেখাগেল আর যায়গা নেই – সে সব স্টোরেজে ঠাসাঠাসি করে রাখা হল। হর্সফিল্ডের বেসমেন্টে আরও dry cellar space-এর অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হল।

সামগ্রিকভাবে, জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনীর বাইরে, সংগ্রহ কিউ বা ব্রিটিশ জাদুঘরের সংগ্রহের মতোই ব্যবহার করা হত। বেশিরভাগ প্রকাশনায় উদ্ভিদ, প্রাণীর সম্মিলিত সংরক্ষণাগার এবং ভূতাত্ত্বিক, জীবাশ্মবিদ্যা, এবং নৃতাত্ত্বিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য যোগ করত। প্রায়শই এই প্রকাশনা, যেমন হর্সফিল্ডের Plantae Javanicae Rariores (1852); এটা ক্যাটালগ আকারে একটি অঞ্চলের উদ্ভিদের সমীক্ষা। এছাড়াও প্যাট্রিক রাসেলের Account of Indian Serpents, Collected on the Coast of Coromandel (1796), প্রাণীর তালিকা করে তার ব্যবহার আর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অধ্যায় সাজানো হয়েছে (যেমন বিভিন্ন সাপের বিষ এবং সম্ভাব্য প্রতিষেধক)।34 অন্য কোম্পানির লেখকদের মত, রাসেল বর্ণনার বাইরে গিয়ে শ্রেণীবিভাগের প্রস্তাব করেন (স্কেল ডিজাইন ভিত্তি করে)। ১৮৫০-এর দশকের শেষে কোম্পানি ব্রিটিশ সরকারের সাথে জুড়ে যাওয়ার পর, পুরো সংগ্রহটি, হোয়াইটহলের সরকারি অফিসে সশস্ত্র বাহিনীর নিজস্ব জাদুঘর, রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস মিউজিয়ামের (কোম্পানির জাদুঘরের মতই আকর্ষণীয়) ঠিক পাশেই উঠে যায়।

১৮৩০/৪০-এর দশকে, স্টোরেজ স্পেস দুষ্প্রাপ্য হলেও, হর্সফিল্ড এবং কোর্ট অফ ডিরেক্টরস কোম্পানির কর্মচারীদের লন্ডনে নমুনা পাঠাতে নিরুৎসাহিত করে নি। উপনিবেশ থেকে লন্ডনে সংগ্রহ স্থানান্তরের হর্সফিল্ডের বস্তাপচা যুক্তি ছিল জলবায়ু – নমুনা আর পাণ্ডুলিপি গ্রীষ্মমন্ডলীয় তাপ আর আর্দ্রতায় নষ্ট হবে; স্টোরেজে সুরক্ষা এবং যত্ন সেখানে যথেষ্ট ছিল না। মাথায় রাখুন কোম্পানির বিপুল সংগ্রহের কিছুটা গিয়েছে লন্ডনের কিউরিও দোকানে, কিছুটা অবহেলায় পড়ে নষ্ট হয়েছে। আরও খারাপ হল লিডেনহল স্ট্রিটের সেলারগুলো ভর্তি থাকায় কখনও কখনও নিউ স্ট্রিটের গুদামে নমুনা ক্রেট “শহরের ধুলো, ইঁদুর এবং অন্যান্য পোকামাকড়”-এর মধ্যে পড়ে থাকত।35

এমনকি লিডেনহল স্ট্রিটের নীচের স্টোরের অবস্থাও ভালো ছিল না। ১৮৫৮-র ফেব্রুয়ারিতে, কাজের জন্য আফগানিস্তানের নমুনা দেখতে চেয়ে, কিউ-এর রয়েল বোটানিক্যাল গার্ডেনের পরিচালক জোসেফ হুকার, সেলার স্টোরে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে লিখলেন “আমি সংগ্রহগুলি প্রচুর পরিমাণে পেয়েছি; কিছু বন্ধ বাক্সে আছে; অন্যগুলি আংশিক সাজানো আছে, বিভ্রান্তি এতটাই বেশি যে এসব কোথা থেকে বা কারা সংগ্রহ করেছিল বোঝা দায় – অধিকাংশ নমুনা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া আর পোকা কেটে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে এর অনেকগুলোই অপূরণীয় নষ্ট হয়েছে (I found the Collections to be of enormous bulk; some are in unopened Chests; others are partially arranged, & the confusion is so great that it will be difficult to determine where, or by whom, many were collected—they have also suffered to such a degree from damp and the ravages of worms that it is to be feared many are irretrievably ruined)।” নমুনাগুলির অবস্থা নিয়ে চিন্তিত হুকার সেগুলোকে কিউ-তে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল কোম্পানি প্রক্রিয়াকরণের খরচ বহন করুক আর কিউ-কে নমুনার নকল করার প্রথম অধিকার দেওয়া হোক। ছয় মাস পরে (যে সময়ের মধ্যে সংসদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাতিল করে ক্রাউনের কাছে এর কার্যভার হস্তান্তর করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছিল), এগারোটি কার্টলোড প্ল্যান্ট লিডেনহল স্ট্রিট থেকে কিউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়। ছয় বছর ধরে হুকার ১,১০,০০০-এরও বেশি কোম্পানি-নমুনা প্রক্রিয়া এবং সংরক্ষণ দেখাশোনা করেন।36

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাদুঘর থেকে কিউ-এর নমুনা যাওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা ছিল না, অথবা লিডেনহল স্ট্রিটের উপচে পড়া সংগ্রহ শুধুই কিউ-তেও যায় নি। শুরু থেকেই, কোম্পানির জাদুঘর প্রায়শই সাম্রাজ্য থেকে আসা পণ্যের জন্য চূড়ান্ত স্টোরেজ হিসাবে ব্যবহার না করে শুধুই বাছাই বা চালনী ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সুসংরক্ষিত নমুনা এবং বিরল দ্রব্য প্রথমে “অন্য জাতীয় সংগ্রহশালা”-য় (অনেক সময় ডিসপ্লেতে জাদুঘর শুধুই ডুপ্লিকেটই দেখাত) পাঠানোর প্রস্তাব করা হত, যেমন হর্সফিল্ড ব্রিটিশ জাদুঘর এবং কিউ-এর নাম বলেছিলেন। অন্য অবাঞ্ছিত নমুনা ব্রিটেন থেকে ইউরোপে এবং বিদেশে ছড়িয়েছে। কিউ, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, পরের দিকে কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ছিল অকোম্পানি নমুনা প্রাপক থাকবন্দীত্বের প্রথম সারির, আশ্চর্যজনকভাবে জাদুঘর থেকে নমুনা নেওয়ার জন্য নানা ধরণের প্রতিষ্ঠান লাইন দিত। ১৮৩০-এ হর্সফিল্ড, সুইস উদ্ভিদবিদ, প্রাকৃতিক ইতিহাসের অধ্যাপক অগাস্টিন পিরামাস ডি ক্যান্ডোলকে “ইন্ডিয়া হাউসে জমা থাকা সংগ্রহ থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখির সংগ্রহ” উপহার দেন, যা “জেনেভার পাবলিক মিউজিয়াম”-এ যায়। এর বেশিরভাগই জাভার হর্সফিল্ডের নিজস্ব সংগ্রহ থেকে নেওয়া এবং সেগুলির অবস্থা খুব ভাল ছিল না – “এই নমুনাগুলি গ্রহণ করার সময়, আমি প্রার্থনা করি আপনি এটি বিবেচনা করে খুশি হবেন যে, ভারতীয় জলবায়ুর প্রভাবের কারণে, অনেক বিষয় জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য অযোগ্য বলে মনে হতে পারে; তবে আশা করা যায় যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলি রেফারেন্স এবং পরীক্ষার জন্য কার্যকর হবে (In receiving these specimens I pray you may be pleased to consider that, from the effects of an Indian Climate, many of the subjects may be found unfit for the preparation required for preserving them in a Museum; it is however hoped that they may prove useful for reference and examination, in a scientific point of view)।”37

লন্ডনে ফিরি। লিনিয়ান সোসাইটি, জুওলজিক্যাল সোসাইটি এবং জিওলজিক্যাল সোসাইটিকে নিয়মিত লিডেনহল স্ট্রিটের স্টোর থেকে নমুনা পাঠানো হয়েছে। হর্টিকালচারাল সোসাইটি জাদুঘরে আসা বীজ বিতরণে সহায়তা করত। ছোট ছোট পৌরসভাও নমুনা পেয়েছে যেমন ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, আইল অফ ওয়াইট, কর্নওয়াল, ডাবলিন, বোস্টন এবং ফিলাডেলফিয়া—এবং আরও দূরের মিসৌরিও। হুকারের সঙ্গঠিত উদ্যোগে কোম্পানির বেশিরভাগ নমুনা বিশ্বের বহু জাদুঘরে পাঠানো হয়। হিউ ফ্যালকনারের শিবালিক পাহাড়ের জীবাশ্মের বেশিরভাগই গিয়েছে ব্রিটিশ জাদুঘরে; তবে কোম্পানি এর প্লাস্টার-কাস্ট কপি তৈরি করে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, সেন্ট পিটার্সবার্গ একাডেমি অফ সায়েন্স, অ্যাডিসকোমে মিলিটারি একাডেমি, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ভারত এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছে। রে ডেসমন্ডের মতে, কোম্পানির এই উদ্যমে চৌষট্টি বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, সমিতি এবং ব্যক্তি উপকৃত হয়।38 এইভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশ্বজুড়ে শত শত সংগ্রহশালায় বিস্তৃত বিনিময়, বিনিময়, ক্রয় এবং উপকরণ দানের অর্থনীতিতে একজন বিশিষ্ট অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বৈজ্ঞানিক সমাজের বিস্তার আদতে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির সঙ্গী ছিল। লন্ডনের সমিতিগুলোর কয়েকটা – রয়েল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (প্রতিষ্ঠিত ১৮০৪, চার্টার্ড ১৮৬১), জিওলজিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮০৭, আনুমানিক ১৮২৫), রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮২০, আনুমানিক ১৮৩১), সোসাইটি ফর দ্য ডিফিউশন অফ ইউসেবল নলেজ (প্র ১৮২৬), জুওলজিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮২৯), জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮৩০, আনুমানিক ১৮৫৯), ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স (প্র ১৮৩১), এনটমোলজিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮৩৩), এথনোলজিক্যাল সোসাইটি (প্র ১৮৪৩), এবং হাকলুইত সোসাইটি (প্র ১৮৪৬)। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি এবং ব্যক্তিগত সদস্যপদ সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে অর্থায়ন করা, ব্রিটেনের সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক সমিতিগুলি ব্যক্তিগত, নাগরিক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের অনন্য ব্রিটিশ রূপের আদর্শ চিত্র। এখানে, বিখ্যাত অপেশাদাররা সমৃদ্ধি লাভ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান অনুষদ অথবা অন্য পেশাদার পদ অস্তিত্বের অনেক আগেই বিজ্ঞানে নিবেদিতচর্চার জন্য স্থান এবং সম্পদ তৈরি করা হয়েছিল। সংসদ কিন্তু রয়েল সোসাইটি বা ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনকেও সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিপটেমি করেছে।39

তবে, সরাসরি সরকারি তহবিলের সাহায্য পাওয়ার থেকেও কোম্পানি জাদুঘর থেকে প্রসারিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিভিন্ন উপায়ে এই সমিতি বিকাশে সহায়তা করেছে। প্রথমত, বৈজ্ঞানিক ক্লাব এবং সমিতিগুলো রাষ্ট্রীয় কর্মচারী যেমন কোম্পানি কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর সদস্য, রাজনীতিবিদ এবং সরকারি আমলাদের বিনা বেতনের শ্রমে উপকৃত হয়েছে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে – জুওলজিক্যাল সোসাইটির প্রথম সভাপতি (এবং “প্রতিষ্ঠাতা”ও বটে) ছিলেন জাভার প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট-গভর্নর, স্যার স্ট্যামফোর্ড র‍্যাফেলস। জুওলজিক্যাল সোসাইটির সমিতির তালিকায় নানা ধরণের মানুষ থাকলেও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অধিকংশ অভিজাত, রাষ্ট্রীয় কর্মচারী। তালিকায় ছিলেন একজন জমিদার অভিজাত (নিকোলাস ভিগরস), একজন উদারপন্থী এমপি, একজন “ফ্যাশনেবল এস্থেটিস্ট” (চার্লস বেরিং ওয়াল — সওদাগর চার্লস ওয়ালের পুত্র), একজন শুল্ক আমলা (জোসেফ সাবিন), একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (হেনরি ল্যান্ডসডাউন), এবং একজন হুইগ রাজনীতিবিদ যিনি অ্যাডমিরালটির প্রথম লর্ড এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের গভর্নর-জেনারেল (জর্জ ইডেন)। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কৃতিতে ধনী অপেশাদার, রাজনৈতিক অভিজাতদের ভূমিকা বিতর্ক এবং সমালোচনা জন্ম দেওয়া40 সত্ত্বেও, অধিকাংশ সমিতির সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগ ছিল, বলেই তারা আংশিকভাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কক্ষপথে এসেছে। জুওলজিক্যাল সোসাইটির ক্ষেত্রে, ক্রাউন-সংযোগ বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হবে – সংগ্রহ রক্ষার জন্য রানী ভিক্টোরিয়া সমিতিকে রিজেন্টস পার্কের একটি অংশ দান করবেন।

সেই সময়ের বহু নতুন সমিতিই নমুনা সংগ্রহের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জুওলজিক্যাল সোসাইটির প্রাথমিক কাজের বেশিরভাগই ছিল তাদের সংগ্রহগুলি মাটি থেকে তুলে ধরার জন্য নিবেদিত (Much of the early work of the Zoological Society, for example, was devoted to getting their collections off the ground)। ১৮২৫-এর প্রথম কাউন্সিল সভার নির্দেশের মধ্যে একটি ছিল লন্ডনের টাওয়ার এবং এক্সেটার এক্সচেঞ্জের মেনাজারির রক্ষকদের সাথে “সমাজের কাছে উপস্থাপিত হতে পারে এমন প্রাণীদের অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যতক্ষণ না তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়।” বেশ কয়েকটি নমুনার মধ্যে ছিল সোসাইটিকে দেওয়া বেশ কয়েকটি নতুন উপহার (জোশুয়া ব্রুকসের দুটি “লোভী পাখি rapacious birds ” এবং কলকাতার উপকূলের একটি দ্বীপ থেকে একজন নৌ ক্যাপ্টেনের দেওয়া হরিণ)। কর্মকাণ্ডের বাকি অংশ ছিল সোসাইটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, এর মেনাজারি, জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার পরিচালনার জন্য চারটি প্রধান কমিটি তৈরি। ১৮২৯-তে জুওলজিক্যাল সোসাইটি রাজকীয় সনদ পাওয়ার পিছনে এতদিনের সংগ্রহ করা নমুনা আর অর্থের বড় অবদান ছিল কারন এগুলোর মাধ্যমে সমিতির মর্যাদা তৈরি হয়েছে। সনদে বলা হয়েছে “প্রাণীজগতের নতুন এবং কৌতূহলী প্রজাতিগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার” জন্য এই সমিতি গঠিত হয়েছিল এবং সদস্যরা ইতিমধ্যেই “এই উদ্দেশ্যে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ তুলেছে এবং ব্যয় করেছে”। ১৮২৭-এর জিওলজিক্যাল সোসাইটির সনদে বলা হয়েছে সদস্যরা ইতিমধ্যেই “বই, মানচিত্র, নমুনা, অন্যান্য জিনিসপত্র ক্রয় এবং সংগ্রহ আর বিভিন্ন কাজের প্রকাশনায় যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে।” ৪১

সমিতিগুলোর সংগ্রহ বেড়েছে কিছুটা কোম্পানির দানের সুবাদে, কিছুটা অ্যাডমিরালটি আর রাষ্ট্রের শাখাগুলোর উদ্যমে জরিপ এবং সমুদ্রযাত্রায়। এই সময়কালে ব্রিটেনে সমিতিগুলোর বাড়বাড়ন্ত কেবল ব্রিটেনের ভিক্টোরিয় বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি গঠনে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সম্পদ বিনিয়োগের প্রতিফলন নয়, একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের ফলে রূপান্তরিত বস্তুগত সংস্কৃতির সাথে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির যোগের ফল। মাথায় রাখা দরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতোই সমিতিগুলোরও সরকারী আর ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমানা খুব স্পষ্ট নয়। তবে একটা কথা স্পষ্টভাবে বলা যাক ব্রিটেনে বৈজ্ঞানিক সমিতিগুলোর বাড়বৃদ্ধি, সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী এবং প্রশাসনিক দখলদারি প্রবণতারই প্রতিফলন।

একই সাথে, আরও একটা কথা জোর দিয়ে বলা উচিত লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঞ্চয়ের উদ্যম সাম্রাজ্যের অন্য সংগ্রহের প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। অসংখ্য ঔপনিবেশিক সংগ্রহের ভাগ্য কোম্পানির যাদুঘরের নমুনা সংগ্রহ ক্ষুধার ওপর নির্ভরশীল ছিল।42 সম্ভবত কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির মত কোম্পানি জাদুঘরের সাথে অন্য কোনও ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান এতটা ঘনিষ্ঠভাবে জুড়ে ছিল না। এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহ নির্ভর করে ১৮৭৫-এ ব্রিটিশ ভারতে প্রথম জাতীয় জাদুঘর তৈরি হয়। লন্ডনে কোম্পানির জাদুঘর এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির মধ্যে সম্পর্কের গতিশীলতা, অন্তত এই সময়কালে, আলোচিত লন্ডন সমিতিগুলির সাথে সম্পর্কের বিপরীত ছিল।43 এশিয়াটিক সোসাইটি গঠন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল নমুনা সংগ্রহ। আঠারো শতকে এশিয়াটিক সোসাইটির কিছু সংগ্রহ কর্মকর্তাদের বাড়িতে থাকত, কিন্তু ১৮০৬-এ সোসাইটির স্থায়ী ভৌত আবাস তৈরির পর জাদুঘর পরিকল্পনা করা হয়। ড্যানিশ সার্জন এবং কলকাতায় কোম্পানির বোটানিক গার্ডেনের পরিচালক নাথানিয়েল ওয়ালিচ (১৭৮৬-১৮৫৪), এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহের প্রথম কিউরেটর। ১৮১৪-তে এশিয়াটিক সোসাইটিকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লেখেন বিদ্বত সমাজের অন্যতম উদ্দেশ্য হল নমুনা সংগ্রহ- ” A collection of the substances which are the objects of science and of those reliques which illustrate ancient times and manners, has always been one of the first steps taken by Societies instituted for the dissemination of specific or universal knowledge. Such a collection was one of the first objects also of the Asiatic Society।” সমসাময়িকদের মতো, ওয়ালিচ বিশ্বাস করতেন বৈজ্ঞানিক মূল্য নমুনা সঞ্চয়ের প্রক্রিয়াতেই অর্জিত হয় – ” It is, however, in the departments of science that a Museum in this country would be found most specially serviceable, and the facility of its accumulation is proportionable to the extent of its utility. In Natural History, Botany, Anatomy, Chemistry, Mineralogy and other branches, a collection would accumulate rapidly if once commenced; and from the first moment of its accumulation would furnish additional matter to the stock of knowledge।”44 ওয়ালিচ নির্দিষ্ট স্থানে বিজ্ঞান অনুশীলনের জন্য নমুনা সংগ্রহের সঙ্গে প্রকৃতির দ্রব্যের অ্যাক্সেসের গুরুত্বের পক্ষে সওয়াল করেন – তার কেন্দ্রিয় কৌশল ছিল স্থানীয় অঞ্চলে বৈজ্ঞানিকচর্চা বিকাশের নমুনা সংগ্রহ করা।

কলকাতার এই ধরনের সমিতির পক্ষে নমুনা রক্ষণাবেক্ষণের মূল্য দ্রব্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল বাধা ছিল। কোনও সংগ্রহশালা পরিচালনা শুধুই সভা আয়োজন এবং প্রকাশনা লেনদেন নয়, তার বাইরেও প্রচুর খরচ জড়িয়ে থাকত – সংরক্ষণ স্থান খুঁজে বের করা, গ্রন্থাগারিক বা কিউরেটর নিয়োগ করা, মাউন্টিং-এর খরচ, সংরক্ষণ এবং ক্যাটালগ প্রকাশ ইত্যাদি। অন্তত কলকাতায় ওয়ালিচ বলছেন সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ Many objects with which we are exceedingly familiar in this country are new or imperfectly known to general science and … each … would contribute some interesting supply to the extensive results of western enquiry।45

ওয়ালিচের আশা সার্থক করে সোসাইটির সংগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে —“চীন, নিউ সাউথ ওয়েলস, কেপ থেকে এবং সম্মানিত কোম্পানির প্রতিটি অঞ্চল থেকে, প্রাকৃতিক ইতিহাস, খনিজবিদ্যা এবং ভূতত্ত্বের নমুনা যত দ্রুত সম্ভব স্থান দেওয়া গিয়েছে।”সংগ্রহ বেড়েছে, খরচও বেড়েছে, ১৮৩৬-এ দেনায় ডুবে থাকা সোসাইটি সংগ্রহ বিক্রয়ের কথা ভাবছিল। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অর্থায়নে এত বড় হয়ে ওঠার পর, সোসাইটির সংগ্রহ নির্ভর করে ভারত সরকারের প্রথম জাতীয় জাদুঘর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় জাদুঘর ছিল লন্ডনে। এশিয়াটিক সোসাইটির সংগ্রহ প্রদর্শনীর জন্য সরকারি সহায়তায় একটি জাতীয় জাদুঘর তহবিল তৈরি অনুরোধ জানিয়ে যোগাযোগ করা হলে, বাংলার গভর্নর-জেনারেল জুওলজিক্যাল সোসাইটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্জ এডেন প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিলেন কারণ পরিচালনা পর্ষদ ইতিমধ্যেই “যথেষ্ট ব্যয়ে” একটি গ্রন্থাগার এবং জাদুঘর চালাচ্ছিল। ইডেন বিশ্বাস করতেন “ইউরোপের এই ধরনের প্রতিষ্ঠান, যতই নিখুঁত হোক না কেন, ভারতে অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অগ্রাহ্য করা যাবে না,”। তবে তার মনে হয় নি কোর্ট অফ ডিরেক্টরস ভারতে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তহবিল বরাদ্দ করবে।46

এই প্রস্তাব লন্ডনে পাঠানোর খবরে সোসাইটি সংগ্রহগুলোর মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ২০০ টাকা অন্তর্বর্তীকালীন ভাতা চেয়েছিল। কোর্ট অফ ডিরেক্টরস ১৮৩৯এ জানায় “নমুনা তৈরি এবং সংগ্রহশালা সুশৃঙ্খল রক্ষণাবেক্ষণের খরচের” ছোট অঙ্কের অর্থ দিতে আপত্তি নেই’। তবে জাতীয় জাদুঘর নিয়ে চুপ ছিল। বাংলা সরকারকে তারা এশিয়াটিক সোসাইটির জাদুঘরের নমুনা কেনার জন্য অল্প তহবিল খরচের অনুমতিও দিয়েছিল, যতক্ষণ না on all such occasions, you will forward to our Museum [i.e., the one at India House] a selection from the articles which may have been so procured 47

হর্সফিল্ড এশিয়াটিক সোসাইটির নতুন সংগ্রহের প্রকাশনা Transactions নজরদারিতে রেখেছিলেন। কোম্পানির কর্তব্যরত আমলাদের জোগাড় করা নমুনা কোম্পানি জাদুঘরে পাঠানোর আগ্রাসী চাপ তৈরি করতেন তিনি। এশিয়াটিক সোসাইটির নতুন নমুনা সংগ্রহ অনুদানকে হর্সফিল্ড ব্যাখ্যা করলেন লন্ডন জাদুঘরের অধস্তন হিসেবে জুড়ে থাকার চুক্তি হিসেবে। ভুটান এবং নেপাল থেকে সংগৃহীত হারানো জিনিসপত্রের খোঁজে সোসাইটিকে লেখা চিঠিতে এই বিষয়টি উল্লেখ করে বললেন, We now call your attention to several points respecting the relation in which the Asiatic Society is placed towards the Company’s Museum in England in consideration of this grant: . . . For any naturalist or officer who may accompany any mission or deputation on behalf of Government, the most full and complete series resulting from his labors . . . the most valuable and interesting results of scientific deputations and missions on behalf of Government… are to be dispatched to England for the Company’s Museum by the earliest opportunity.48

সুতরাং, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর ব্রিটেনে বৈজ্ঞানিক সমিতির বাড়বাড়ন্তকে বৃহত্তরভাবে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদীতার দখলদারির বৈশিষ্ট্য হিসাবে দেখলেই একমাত্র কোম্পানি সাম্রাজ্যের যে কোনও প্রান্তে লিডেনহল স্ট্রিটের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহের জন্য চাপ দেওয়ার প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বোঝা যায়।

হর্সফিল্ডের কলকাতা জাদুঘরের উপর দাবি চাপানোর তুলনায় অনেক জটিল ছিল কোম্পানির নমুনা সংগ্রহের আন্তঃআঞ্চলিক চিত্র। For one thing, the Asiatic Society of Bengal’s collections were growing overall, as were those of the branch societies in the Madras and Bombay presidencies। ১৮৩০-এর দশকে মাদ্রাজও নমুনা সংগ্রহের জন্য সামান্য কিন্তু নিয়মিত সরকারি ভর্তুকি পেয়েছে, এবং নিয়মিত লন্ডনে উপকরণ পাঠিয়েছে। কোম্পানির শাসন অঞ্চলগুলোর মধ্যে কলকাতা নিজস্ব আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল কারন এখানে কোম্পানির বিভিন্ন শাসন অঞ্চল থেকে প্রচুর নমুনা দান হিসেবে আসত। যেমন ম্যাকাওতে তথাকথিত ব্রিটিশ জাদুঘর। ১৮২৯-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তিনটি সুপারকার্গো সেখানে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি গ্রন্থাগার আর প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর। গ্রন্থাগার এবং জাদুঘরের সংগ্রহগুলি মূলত কোম্পানির কর্মীদের অনুদান। তবে ব্যক্তিগত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী এবং পর্তুগিজ স্থানীয়দেরও অবদান ছিল। ম্যাকাও জাদুঘরের নমুনা প্রদর্শনী বেশ কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে ১৮৩৩ সালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনা একচেটিয়া অধিকার হারানোর সময় পর্যন্ত। সেই তরল সময়ে সুপারকার্গোরা কোম্পানির বাকি সরঞ্জামের সাথে এই সংগ্রহটাও কলকাতায় আনে। কিছু অংশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে দান করা হয়; ব্যবসায়ী রবার্ট ইংলিস তার পাখির সংগ্রহ সোসাইটির জাদুঘরে দান করেন। কিন্তু এই সংগ্রহের সুপরিচিত অংশের বেশিরভাগটাই – যেমন জন রিভসের মাছের সংগ্রহ – লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে পৌঁছাল। ‘জার্নাল অফ দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’ লিখছে, “পুরো [ম্যাকাও] সংগ্রহটি কলকাতায় স্থানান্তর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, দুঃখজনক হল এই উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা হয়।”49 সামগ্রিকভাবে, কোম্পানির আয়ুষ্কালের বাকি সময় এবং তার পরেও, লন্ডনেই জিনিসপত্র তীব্র গতিতে সর্বাধিক সংখ্যায় জমা হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তথ্য এবং যোগাযোগের প্রবাহে স্থির বা সরল কিছু ছিল যার উপর এই সংগ্রহ ভৌগোলিক অঞ্চলগুলি নির্মিত হয়েছিল। একই সাম্রাজ্যিক অবকাঠামোর মাধ্যমে ইউরোপ থেকে উপনিবেশিত অঞ্চলে নমুনা রপ্তানি করা হত। মূলত এগুলি ছিল “প্রাকৃতিক উৎপাদন”-এর পরিবর্তে “কৃত্রিম উৎপাদন”; ১৮২৪ সালে আলেকজান্ডার ম্যাকলির লন্ডন থেকে সিডনিতে পোকামাকড়ের সংগ্রহ পাঠানোর সিদ্ধান্তটি অস্বাভাবিক ছিল।৫০ ইউরোপ থেকে অফিসার বা ব্যবসায়ীদের আমদানি করা বই, শিল্পকর্ম এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির চালান আরও সাধারণ ছিল। ৫১ একইভাবে, উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে স্থানীয় অভিজাতদের অনেকেই ইউরোপীয় শিল্প ও নিদর্শন সংগ্রহ করতেন ৫২ এবং কিছু উপাদান এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে এবং অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। টিপু সুলতানের প্রাসাদ লুণ্ঠনে ছিল তার ইউরোপীয় বই, শিল্পকর্ম এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির বিশাল সংগ্রহ। ট্রাভানকোরের মহারাজার মানমন্দির থেকে পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য ১৮৪০-এর দশকে ব্রিটেনে পাঠানো হয়েছিল এবং ত্রিশ বছর পরে, ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ১৮৭০ এবং ১৮৮০-এর দশকে এটিও (বর্তমানে প্রাক্তন) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংগ্রহের অন্তত অংশের ভাগ্য হবে, যা ১৮৯০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ছড়িয়ে পড়ে।

ন্যাথানিয়েল ওয়ালিচ এই সময়ে বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের ধারণার সাথে সংগ্রহের গুরুত্বকে তুলে ধরেন। এই প্রবন্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি কীভাবে এই ধরনের সংগ্রহের কাঠামো, পরিধি এবং বিতরণকে প্রভাবিত করেছিল তার কয়েকটি বর্ণনা করা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাদুঘর গঠন ছিল লন্ডনের উপনিবেশের এজেন্ট এবং প্রশাসকদের মধ্যে পরিচালিত কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘস্থায়ী নাটকের একটি মাত্র কাজ। তবে, এই আইনটি কেন্দ্র/পরিধি বিভাজন জুড়ে বিজ্ঞানের জন্য নির্দিষ্ট পরিণতি বয়ে আনবে।

বিজ্ঞান এবং সাম্রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক সংযোগগুলির মধ্যে একটি হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির বিজ্ঞানের বস্তুগত সংস্কৃতির সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা: সাম্রাজ্যের জিনিসপত্র বিজ্ঞানের জিনিসপত্র হয়ে উঠবে। এই উপকরণের বেশিরভাগই সরাসরি সামরিক, বাণিজ্য বা কূটনৈতিক অভিযানের সাথে যুক্ত ছিল, কিন্তু একবার নমুনা এবং প্রতিবেদনগুলি লিডেনহল স্ট্রিটে পৌঁছানোর পর, জাদুঘরের ভাণ্ডারগুলির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে, এই লুণ্ঠন সমগ্র ইউরোপ এবং তার বাইরেও বিজ্ঞানের বিকাশে সহায়তা করত। যদিও এটি ধারাবাহিকভাবে (অন্তত ১৮৭০ সাল পর্যন্ত) নিজস্ব ভাণ্ডার তৈরি করেছিল, জাদুঘরটি একটি চালনী বা ফিল্টার বা কেন্দ্রীয় বিতরণ গুদামও ছিল, সর্বদা পরিবর্তিত হয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলিকেও তার নিজস্ব ভাণ্ডার হিসাবে সরবরাহ করত। একই সময়ে, মিল এবং হর্সফিল্ডের মতো ব্যক্তিত্বদের কেন্দ্রীভূতকরণের প্রচেষ্টা কিছু উপায়ে অন্যান্য ঔপনিবেশিক অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক উপকরণ সংগ্রহকে সীমাবদ্ধ করতে কাজ করবে। এই ক্ষমতায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য জুড়ে বিজ্ঞানের উপাদান এবং বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের প্রকৃতিকে রূপান্তরিত করেছিল।