লিখছেন বিশ্বেন্দু নন্দ

সময়টা নবজাগরিত বাবুদের সাম্রাজ্য-লুঠের সঙ্গী হওয়ার। জয়কৃষ্ণ যখন ভরতপুর লুঠের মাল নিয়ে উত্তরপাড়ায় ফিরছেন রামমোহন দ্বারকানাথ মধ্যগগণে। তিনি ফিরে জমিদারিতে মন দেবেন।

১৮০৮এ জন্ম জয়কৃষ্ণর। আদি নিবাদ ফুলিয়া। ঠাকুদ্দা নন্দগোপাল বিবাহ সুত্রে উত্তরপাড়ায় আসেন। ১৭৯৪এ মারা যাওয়ার সময়, ছেলে জগমোহনের দুবছরমাত্র বয়স। ঠাকুমা শিবানীদেবী যুগের হাওয়া বুঝে তাঁকে কলকাতায় ইংরেজি শেখান। ২০ বছর বয়সে জগমোহনের চাকরি হয় কলকাতার কমিসারিয়েটে। উচ্চাভিলাষী জগমোহন পদাতিক বাহিনীর মেস রাইটারের পদ খুঁজে নেন। বাহিনীর সঙ্গে নানান জায়গায় ঘোরেন, মীরাটে পেমাস্টার পদে নিযুক্ত হলেন। তার আগেই জগমোহনের বিবাহ শেষ – ছেলেও হয়েছে – নাম জয়কৃষ্ণ। ঠাকুমা তেজারতির কারবার করতেন। ছোটবেলা থেকেই ঠাকুমার হিসেব রাখতেন জয়কৃষ্ণ। যুগের দাবি বুঝেই বাবার মত ইংরেজিও শেখা শুরু করেন বাল্য বয়সেই।

১৮২০তে জগমোহন উত্তরপাড়ায় আসেন। মীরাটে যাওয়ার আগে নামে এজেন্সি হৌস কলভিন এন্ড কোংএ কিছু রূপার পাত্র আর সামান্য রত্ন গচ্ছিত রেখেগিয়েছিলেন। গুদামবাবু সেগুলি নিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার সেখান থেকে বেশ মোটা টাকা উদ্ধার করেন এবং পরিবারের সুদের ব্যবসা থেকেও বেশ কিছু অর্থ তুলে তৃতীয় বিবাহ এবং দুর্গাপুজো আয়োজন করেন। ১৮২১এ পরিবারশুদ্ধ মীরাটে যান। সকলে চলে এলেও জয়কৃষ্ণ বাবার সঙ্গে থেকে যান মীরাট ছাউনিতে।

এখানে নানানভাবে ব্যবহারিক ইংরেজিতে নিজেকে তৈরি করে তোলেন – বাবার থেকে আরাবিয়ান নাইটস, বাবার সহকর্মী ভোলানাথ ঘোষের থেকে ইউনিভার্সাল লেটার রাইটিং, ক্লার্ক বাবু রাজচন্দ্র নিয়োগীর থেকে কমপ্লিট লেটার রাইটিং শিখতে শুরু করেন। রেজিমেন্টাল স্কুল ছয় মাস পড়েন। গ্রন্থাগারেও নানান বিষয় পড়তে থাকেন। বাবা তাঁকে ক্যাপ্টেন ওয়াটকিনসনের মিলিটারি পে দপ্তরে শিক্ষানবিশি হিসেবে লাগিয়ে দেন। বছর খানেক পরে বাবার মত মেস হৌস আর রেজিমেন্টাল পে মাস্টার হিসেবে এবং ১৮২৪ সালে ক্যাপ্টেন কম্বের আপিসে প্রধান করণিক হিসেবে যোগ দেন।

১৮২৬এ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যান বাবা-ছেলে – যা তাদের ভবিষ্যতের রাস্তা চিনিয়ে দেবে – কোম্পা্নির রাজস্থানের ভরতপুরে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া। বাহিনীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে থাকতে হয়েছিল করণিক বাবা-ছেলের। জয়কৃষ্ণর ইংরেজি দক্ষতা হেতু সেনার নানান গোপনীয় চিঠি পড়তে পেতেন। সেনাপতি নিকোলাসের ধারণা ছিল বালক করণিক জয়কৃষ্ণ ইংরেজি চিঠির চিঠির মর্মবস্তু উদ্ধার করতে অপারগ। তিনি তাকে চিঠি নকল করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। জয়কৃষ্ণ প্রথম ব্রিগেডের সঙ্গে সামনে ছিলেন। জানুয়ারিতে বিনা বাধায় সেনা ভরতপুর কেল্লায় ঢোকে। সৈন্যেরা লুঠ শুরু করে। হাতাহাতি, খুন, জখমের গোলযোগের মধ্যেই তৎকালীন সেনা আক্রমণে বিজয়ী বাহিনীর প্রথা অনুযায়ী রাজপ্রাসাদ, অভিজাতদের বাড়ি, ধনী শেঠেদের বাড়ি ইত্যাদি অবাধে লুঠ হল বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে। কয়েক ঘন্টার বিপুল অবাধ লুঠ পর্ব শেষ হলে প্রাইজ এজেন্টের কাছে জমা পড়ল ১১ কোটি টাকার লুণ্ঠিত বৈভবী দ্রব্য। যে সব দ্রব্য জমা পড়ল না, ব্রিটিশেরা তার মূল্য কষে দেখেছিল অন্তত দ্বিগুণের অনেক বেশি। আইন অনুযায়ী বাঙালি বাবা-ছেলে লুঠের অংশ পায়  ৫৬০০০ টাকা! কিন্তু অগ্রবর্তী সেনার সঙ্গী হয়ে বেআইনি কত লুটে পকেট ভরেছেন সে ইতিহাস মুখার্জীদের সঙ্গে শ্মশানযাত্রা করেছে।

বাহিনীতে কাজের সুবাদে অন্য অনেক সেনানায়কের সঙ্গে যুবা জয়কৃষ্ণের বেশ বন্ধুত্ব হয়। এই বাহিনীতেই বড়লাট লর্ড আমহার্স্টের ছেলে সামরিক শিক্ষা নিবিশী ছিলেন। তার সঙ্গে জয়কৃষ্ণের অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

ভরতপুর আক্রমণের শেষে দুজনকেই আগরা দুর্গে পাঠানো হয়। ১৮২৬এ আবার তারা মিরাট ছাউনিতে ফিরে আসেন। দুই বাঙালি বাবু হঠাৎ সেনাবাহিনীর কাজ ছেড়ে দিলেন। বড়লাটের ছেলের বন্ধুত্ব ঠুকরে, কাজ ছেড়ে বাবা-ছেলে কেন বাংলায় ফিরে এলেন, এর কোনও যথাযোগ্য উত্তর আজও মেলে নি।

বাপ-ব্যাটায় মীরাট থেকে ফিরে এলেন পুরোনো বাস উত্তরপাড়ায়। ১৮২৫এ চুঁচড়ো ওলান্দাজদের থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসারে ইংরেজদের হাতে আসে। ২০০ বছরের কেল্লা অধিকার করে ইংরেজরা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে। যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী বলছেন মিরাট থেকে ফিরে এসে অভিজ্ঞ দুজনই নতুন সামরিক ছাউনিতে কাজে যোগ দিচ্ছেন। বেন্টিঙ্কের ব্যয় সংকোচনের নীতিতে ১৮৩০এ বন্ধ হয় এই ছাউনি। এই সময় জগমোহন কলকাতার চারটি এজেন্সি – মেসার্স ফ্রাইডলি, মেসার্স ফার্গুসন এন্ড কোং, মেসার্স কলভিন ডিনস্লে এন্ড কোং, আর মেসার্স আলেকজান্ডার এন্ড কোংএ তাদের লুণ্ঠিত অর্থ বিনিয়োগ করে। এদের সঙ্গে বিল অব এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে জুড়ে ছিলেন জগমোহন। এছাড়া বিলাতি পণ্যেরও ব্যবসা করতেন। ১৮২৮ সালে জয়কৃষ্ণর বিবাহ হয় পার্বতী দেবীর সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্য অপ্রসন্ন। এজেন্সি হাউসগুলো বহুমানুষের সঙ্গে উত্তরপাড়ার মুখোপাধ্যায়দের বিনিয়োগ নিয়ে ডুবতে শুরু করে ১৮৩১-৩৪ সালে। একে একে বন্ধ হয়ে যায় এজেন্সিগুলো। কপর্দকহীন হয়ে বিশাল সংসারের ভরণ করার জন্যে জয়কৃষ্ণ আবার ইংরেজ কর্তাদের স্মরণ নিলেন। বরাবরের মত ব্রিটিশ প্রভুরা মুখুজ্যেদের হতাশ করে নি। সাহেবদের সুপারিশে  তিনি জেলা জজের অধীনে চৌকিদারির ট্যাক্সো আদায়ের কাজ শুরু করেন ১৮৩১এ। ঐ বিভাগে এক বছর কাজ করার পর হুগলির কালেক্টর, বেলি তাকে অতি লাভের সেরেস্তাদারির কাজ দিলেন। সেরেস্তাদারি ইংরেজ আমলে কিভাবে চলত তা আমরা বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুরের সেরেস্তাদারিত্বের কাহিনী থেকে জেনে নিয়েছি তার উত্তরাধিকারী ক্ষিতীন্দ্র ঠাকুর আর জীবনীকার ব্লেয়ার বিক্লিংএর জবানীতে – কিভাবে ৩৫ টাকা মাস মাইনের সেরেস্তাদার তার উর্দ্ধতনকে ৫০০ টাকা ঘুষ দেয় তার গোপন কথা।

১৭৬৫ থেকেই ব্রিটিশদের লক্ষ্য যেনতেনভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি। বাংলার নবাবি আমলে যত জমি রাজস্বমুক্ত ছিল, সেগুলি খুঁজে খুঁজে রাজস্বের আওতায় আনা হতে শুরু করল। বাংলার প্রখ্যাতরা ব্রিটিশদের হয়ে এই কাজ করেছেন। কারণ বাংলা লুঠের অর্থ দেশে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হলে চিত্তির, হামাগুড়ি দেওয়া শিল্পায়ন মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এর জন্যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে ছিয়াত্তরও করতে হয়েছে তাকে ১ কোটি মানুষ মেরে – এবং সেই বছরই সব থেকে বেশি রাজস্বও আদায় করেছে তারা।

চুঁচুড়ায় এত দিন ওলান্দাজদের নীতি অনুয়ায়ী জমি আর তার রাজস্বের হিসেব হত। এবারে উদয় হলেন স্বয়ং লুঠেরারাজ ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সরকার – তাদের এবং তাদের নবজাগরিত বন্ধুদের কবল থেকে কারোর মুক্তি নাই। ব্রিটিশদের হাতে চুঁচড়ো আসার পর নতুন করে পাট্টা দেওয়া শুরু হল নতুন রাজার রাজস্ব নীতিতে। দায়িত্ব পড়ল যোগ্যতম করণিক জয়কৃষ্ণের ওপর। জয়কৃষ্ণ তখন বেশ কিছু লুকিয়ে রাখা জমির হদিশ পেলেন। গবেষকেরা বলছেন জয়কৃষ্ণ বেশ কিছু প্রভাবশালী প্রজার বিরাজভাজন হন। অভিযোগ জমা পড়ে। তিনি কিছু দিন কারারুদ্ধও হন এবং কয়েকজন ব্রিটিশ কর্মচারী সহ তিনিও পদচ্যুত হন। ইংরেজরা পরে যদিও বুঝল তদের বফাদার জয়কৃষ্ণ নির্দোষ। কিন্তু অপমানিত জয়কৃষ্ণ চাকরিতে ফিরে যেতে অস্বীকার করেন। সাম্রাজ্যের অভয় হস্ত মাথায় নিয়েই নিজেই জমিদারির ব্যবসায় নামার মনস্থির করেন।

কেন জয়কৃষ্ণ সেরেস্তাদারিরতে আবার ফিরতে রাজি হলেন না খতিয়ে দেখি – যদিও হাতে কোনও প্রমান নেই, কিন্তু দ্বারকানাথের উদাহরণে আমরা জানি যে সে সময় সেরেস্তাদারির চাকরিতে দুটো সুযোগ ছিল

১। বেআইনি রোজগার – দ্বারকানাথের চাকরি পাওয়ার সময়ে ঘুষের বড় কড়ার ছিল।৩৫ টাকা বেতনের কর্মচারী তাহার উপরিতন সাহেব কর্মচারীকে মাসিক ৫০০ টাকা দিবার বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন – তিনি নিজে কেন না আর ৫০০ টাকা মুনাফা করিবেন (ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর – দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী)।

 এবং ২। জমিদারির সুলুক সন্ধান করা – তিনি যেমন ভরতপু্র আক্রমনের গোপন সামরিক চিঠি পড়ে অগ্রবাহিনীর সঙ্গে লুঠতে গিয়েছিলেন, তেমনি সেরেস্তাদারিতে কোন জমিদারি সাতান আর কোন জমিদারি নাতান তা বিলক্ষণ জানতে পেরেছিলেন চাকরি করার সময়। 

ভদ্রবিত্ত বাঙালিকে জমিদারি চুষিকাঠি ধরিয়েছে ইংরেজ। পলাশীর পর যতটুকু লুঠের অর্থ জোগাড় করতে পেরেছিল দাদনিবণিকদের উত্তরাধিকারী বাঙালি অবাঙ্গালি সক্কলে, তারা তাদের সর্বস্ব দিয়ে যে জমাটুকু রেখেছিল, তা সব ব্রিটিশ শিল্পাযনের যুপকাষ্ঠে বলি দেয় জমিদারি কিনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে। অনুপস্থিত থেকেই জমিদারিতেই মন দিতে থাকে শহুরে ভদ্রবিত্ত বাঙালি। তাকে জমিদারির মধু খাওয়ার পথ দেখিয়ে গিয়েছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর।

ক্ষিতীন্দ্রানাথ ঠাকুর তাঁর পূ্র্বপুরুষ, দ্বারকানাথের জীবনীতে বলছেন, …দ্বারকানাথ ২৪ পরগণার কালেক্টরেটের সেরেস্তাদার হওয়াতে কোন জমিদারীর কিরূপ আয়, সাতান কি নাতান, এই সকল বিষয় সকলই নিশ্চই জানিতে পারিয়াছিলেন। সুতরাং যেই কোন জমিদারী নীলামে উঠিল, অমনি তাহা কিনিয়া লইলেন। …কালিগ্রাম ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দে এবং সাহাজাদপুর ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে এবং অন্যান্য জমিদারীও এই সময়ের কাছাকাছি কেনা হইয়াছিল।  শুধু দ্বারকানাথের মত কলকাতার সৌভাগ্যবানেরাই নয়, জেলার নানান সুযোগসন্ধানী – যেমন জয়কৃষ্ণ, সাম্রাজ্যের নানান সেবা করার ফলস্বরূপ এই উপহার অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেন। চাকরি করে যা রোজগার করেছেন, সেই পুঁজি নিয়েই তিনি নিজে জমিদারি কিনে, নতুন করে ভাগ্য ফেরানোর কাজে নামলেন। 

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের জমিদারি নিয়ে আলোচনার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তার সময় কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জমিদারিও যে একটা গুরুত্বতম  কাজ, এই কাজ করতে গায়ে গতরে খাটতে হয়, কষ্ট করে গ্রামে থেকে নবাবি আমলের মত প্রজাদের সমস্যা বুঝতে হয়, নানান দায়িত্ব নিতে হয়, এ সব ধারণা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভাবনায় মোটামুটি উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জমিদারদের বাস হয়েউঠল কলকাতা। পলাশীর পরে রাণী ভবানী ইত্যাদির মত প্রজাবতসল পরম্পরার জমিদারেরা ততদিনে অস্ত গিয়েছেন। যারা আসছেন, তাদের অধিকাংশই জোহুজুর, অন্য পেশার, জমিদারি সম্বন্ধে প্রায় অজ্ঞ।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন প্রয়োগ করার পর থেকে রাজস্ব আদায় অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যায়, রাজস্ব আয় কমে আসে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওয়েলেসলি তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কিত মূল বিধিগুলির কিছু সংশোধন করে জমিদাদের সঙ্গে আপস করার সিদ্ধান্ত নেন। এরই প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয় ১৭৯৯ সালের ৭ নং রেগুলেশন যা সাধারণত হফতম বা সপ্তম আইন নামে পরিচিতি লাভ করে। এ আইনের ফলে রায়তদের ওপর জমিদারদের লাগামহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়। জমিদার বকেয়া আদায়ের নামে প্রজাদের ফসল, গবাদি ও সম্পত্তি ক্রোক এবং বিক্রয় করে বকেয়া আদায়ের অধিকার লাভ করে। স্বত্বাধিকারী হিসেবে তারা খেলাপি রায়তদের তাদের নিজ নিজ কাছারিতে তলব করার ও বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে আটকে রাখার, কোনো খেলাপি রায়ত তার পরিবার ও সহায়-সম্পত্তি নিয়ে অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে গেলে ওই  রায়তের গ্রামের সকলের ওপর পাইকারি জরিমানা আরোপের ক্ষমতা লাভ করে। পরগনাপ্রথা(প্রশাসনিক সুবিধার জন্য জমির বিভিন্ন ধরনের স্বত্বাধিকারীদের অধিকার ও দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতির অভিন্নতার ভিত্তিতে পরগনাগুলিকে দস্তুর বা এলাকায় ভাগ করা হতো। সরকার ও অপরাপর সকল পক্ষ প্রথাগতভাবেই পরগনা দস্তুর বা পরগনা নিয়ম কানুন মেনে চলতে বাধ্য ছিল। পরগনা দস্তুরে পরগনা নিরিখ বলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। পরগনা নিরিখের মাধ্যমে জমির খাজনা, ফিস ও মজুরি, ওজন ও পরিমাপ নিয়ন্ত্রিত হতো। প্রতিটি পরগনার নিজস্ব নিরিখ ছিল যা সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ জানত ও বুঝত, যদিও বহিরাগতদের কাছে এগুলি অদ্ভুত ও কৌতুকাবহ মনে হতো। এ পরগনা দস্তুর ও পরগনা নিরিখ প্রথাগতভাবে বহুকাল পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।} অগ্রাহ্য করে জমিদাররা যথেচ্ছভাবে খাজনা বৃদ্ধির ক্ষমতা লাভ করে। সংক্ষেপে, রায়তগণ এতকাল যাবৎ ঐতিহ্যগতভাবে যেসব প্রথাগত অধিকার ভোগ করে আসছিল হফতম সেসব অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে। রায়ত অসহায় কোর্ফা প্রজায় পরিণত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে বদলে দেয় ১৮১৯ সালের ৮নং রেগুলেশন যা সাধারণভাবে পত্তনি আইন নামে পরিচিতি লাভ করে। এ আইনবলে জমিদার ও রায়তের মধ্যবর্তী একটি বহুস্তরবিশিষ্ট মধ্যস্বত্ব শ্রেণি সৃষ্টি করার অধিকার লাভ করে। বাস্তবিকপক্ষে, এ ছিল জমিদারি ক্ষমতার চরম শিখর এবং একই সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূল উদ্দেশ্যের ব্যর্থতা। এ আইনের আওতায় জমিদারগণ তাদের খেলাপি পত্তনিদারদের জমি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রয় করার অধিকার লাভ করে, ঠিক যেভাবে সূর্যাস্ত আইনের আওতায় খেলাপি জমিদারের জমি নিলাম হয়ে যেতো।

 মুখোপাধ্যায়েরা যখন বিনিয়োগ করতে ঢুকছেন ততদিনে এই বন্দোবস্ত ত্রিশ বছরের যুবক।  বিনিয়োগকারী ভদ্রবিত্তছায়েরা জমিদারির একফোঁটা জ্ঞান আর চালানোর মানসিকতা না নিয়েই তাদের জমিদারির রাজস্ব আদায়, প্রাজাপীড়ন ইত্যাদি জরুরি কাজ একে একে আইনিভাবেই পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, তেপত্তনিদার, ছেপত্তনিদার (বিনয় ঘোষ এরকম ২২ রকম মধ্যস্বত্ত্বভোগীর নাম নিয়েছেন} মত দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বিনাশ্রমে রোজগার করতে থাকেন।

 জয়কৃষ্ণ যখন জমিদারিতে বিনিয়োগ করতে এলেন তখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা লুঠের সময় শুরু হয়েগেছে বহুকাল। যে কোম্পানি ব্যবসার সময় দালাল রেখে পণ্য কিনত, যে কোনও দিন সাধারণ মানুষের ভাষায় কথাবার্তা বলতে পারত না, ব্রিটিশ রাষ্ট্র যাকে কাজে লাগিয়েছিল বাংলা লুঠের কাজ তদারকি করতে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও যে আদতে লুঠের একটা হাতিয়ার এটা পরোক্ষে অস্বীকার করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রয়োগ করতে আমলাদের নানান মহৎ বিতর্ককে ভূমি ব্যবস্থায় পুঁজিবাদের আগমধ্বনি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

জয়কৃষ্ণ যখন জমিদারিতে আসছেন, সে সময় চিরস্থায়ী  বন্দোবস্তর ৮ নম্বর রেগুলেশন নির্ভর করে জমিদারেরা ঔপনিবেশিক লুঠের রাজত্ব নামিয়ে আনছেন। ১৮৩২এ নভেম্বরে সিঙ্গুরে শ্রীনাথ রায়ের জমিদারির কিছু অংশ কেনার পর থেকেই একে একে অন্যান্য জমিদারি কিনতে থাকেন। দ্বারকানাথ ঠাকুর যেমন জমিদারদের থেকে অর্থ ধার করে তেজারতি ব্যবসা শুরু করেন, তেমনি জয়কৃষ্ণও যতদূরসম্ভব তার সাহেব যোগের কারণেই শ্রীরামপু্রের গোস্বামী, ভাগ্যকূলের রায়, দুর্গাচরণ লাহাদের থেকে অর্থ ধার করে জমিদারিতে বিনিয়োগ করছেন। তার বাজার দর এতই, তার ব্রিটিশ ঘনিষ্ঠতা এত বেশি যে জমিদারি কিনতেও বিপুল পরিমান অর্থ জমিদারদের থেকে ধার পেতে অসুবিধে হচ্ছে না।

১৮৪০এ জগমোহনের মৃত্যু ঘটে। জয়কৃষ্ণ নিজে যেহেতু ঔপনিবেশিক লুঠেরা সেরেস্তাদারিতে ছিলেন তার কাছে খবর থাকত কম দামে, সূর্যাস্ত ইত্যাদি আইনে কোন কোন জমিদারি বিক্রি হচ্ছে। তিনি সেগুলি কিনে নিতেন। তিনি উদ্যমী হয়ে একে একে হুগলী, হাওড়া, বর্ধমান, অবিভক্ত মেদিনীপুর, বীরভূম, অবিভক্ত ২৪ পরগণা ইত্যাদি জেলার ৪ লক্ষ বিঘা জমিদারির মালিক হয়ে বসেন।

আদতে জয়কৃষ্ণ বিষয়ে আলোচনা করছি কেন, যে জন্যে আমরা লুঠেরাদের সঙ্গী দ্বারকানাথ বা রামমোহনের কীর্তিকলাপ আলোচনা করি, সেই কারণেই – তিনি ব্রিটিশদের রাজস্ব বাড়াতে সাহায্য করেছেন। অন্য জমিদার আগে বর্ণিত নানান নামের মধ্যসত্ত্বভোগীকে জমিদারিটি নিশ্চিন্তে হস্তান্তর করে কলকাতায় নবজাগণে সাহেবদের পরিকল্পনা অনুয়ায়ী মোসাহেবি করে বা প্রগতিশীলতার নাম করে ইওরোপের স্বার্থ দেখত অথবা ইয়ার দোস্ত নিয়ে বেলেল্লাপনা বা বেশ্যা গমন করত। যেহেতু অষ্টম আইনে জমিদারি হস্তান্তর করা মধ্যসত্ত্বভোগীকে কাজে ফাঁকিমারার জন্যে সোপার্দ করা যেত, জমিদারেরা তাদের ওপর আরও বেশি বেশি নির্ভর করা শুরু করলেন। কিন্তু জয়কৃষ্ণ অন্যধাতুর উদ্যমী। তিনি তার প্রভুদের সন্তুষ্টির জন্যে নিজে গ্রামে ঘুরে ঘুরে লুকিয়ে রাখা জমি খুঁজ বেড়াতেন, যাতে শৈশবেই ইওরোপিয় শিল্পাযনের শিশু মৃত্য না ঘটে, সেখানে জমি থেকে রাজস্ব তুলে পাঠানো যায়।  

গবেষক বলছেন তিনি জমিদারি কিনেই দৌড়োতেন সেটি দেখতে। দেখতেন ভাল ভাল উৎকৃষ্ট জমি নাকি গ্রামের মহাজন, পুরোহিত, গুরু, উকিল, সরকারি কর্মচারী ইত্যাদি অনুতপাদক শ্রেণীর হাতে চলে যাচ্ছে। অনেক সময় মণ্ডল প্রভৃতি রায়তেরা খাজনা জমিকে নিষ্কর হিসেবে বিক্রি করে দিত। সম্পদশালী মানুষ মারা গেলে তার জমি মহাজন, গুরু, পুরোহিতদের নিষ্কর হিসেবে দান করা হত। অনেক জমি লুকিয়ে রাখা হত। এগুলি গোমস্তাদের সাহায্য ছাড়া তালুকদারের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। অনেক সময় গোমস্তা ঘুষ খেয়ে বিষয়গুলো চেপে যায়। তিনি সেগুলোকে রাজস্বের আওতায় আনতেন।

আসলে মাথায় রাখতে হবে বড় পুঁজির উদ্যম উপনিবেশই একমাত্র উৎপাদক – আর সবাই অনুৎপাদক এমন একটা তত্ত্ব ছড়িয়ে আছে। ফলে কোনও জমি যখন সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে কন্ট্রিবিউট করে সেটা আদতে অনুৎপাদক ব্যয়ই ধরে নেয় লুঠেরারা। আমরা যারা কারিগর অর্থনীতির মানুষ, তাদের কাছে এটাই উৎপাদক ব্যয়, আর সব অনুৎপাদক ব্যয়।

সূত্র – ইতিকথা, জানু ২০১৩ ময়ূখ দাস – জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় – মেট্রোপলিটন মনন ফীলান্থ্রপিক চেতনা

[লেখক, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী  সঙ্ঘের সংগঠক। উপনিবেশপূর্ব সময়ের সমাজ অর্থনীতিতে  কারিগরদের ইতিহাসের খোঁজে সর্বক্ষণের কর্মী। হকার, কারিগর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় তিন দশক। বাংলায় পরম্পরার উৎপাদন বিক্রেতাদের বিষয়ে লিখে চলেছেন নিরন্তর। বাংলার উপনিবেশপূর্ব সময়ের পরম্পরার চাষী-হকার-কারিগর-ব্যবস্থা বিষয়ে খোঁজ করছেন। দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ছাড়াও দেশীয় প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। এবাংলার একমাত্র উপনিবেশ বিরোধী পত্রিকা পরমের সম্পাদক। পলাশীপূর্বের বাংলার ৫০ বছর, পলাশীপূর্বের বাংলার বাণিজ্য দুটি মৌলিক পুস্তকের রচয়িতা। বর্তমানে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নির্মাণ প্রকল্প বিষয়ে গবেষণাতে নিমগ্ন রয়েছেন।]