[‘প্রাচ্য’ নাট্যগোষ্ঠীর দুটি সাম্প্রতিক প্রযোজনা]

লিখছেন অত্রি ভট্টাচার্য
‘এ জগৎ মহা হত্যাশালা। জানো না কি
প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষকোটি প্রাণী
চির আঁখি মুদিতেছে! সে কাহার খেলা?
হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি।’
– বিসর্জন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অ্যাবি ম্যান রচিত ‘জাজমেন্ট অফ ন্যুরেমবার্গের সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়-কৃত অনুবাদটির মঞ্চায়ন যখন করছেন নির্দেশক বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন সারা দেশ জুড়ে ওয়াকফ আইনের নামে মুসলমান জনতার ভূমি-লুন্ঠনের আইনি প্যাঁচ পয়জার রচনা করে, আরেক নতুন সামাজিক ‘অপরায়ণ প্রকল্পে’র জন্ম দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর ফ্যাসিবাদী সরকার। এহেন পরিস্থিতিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নাৎসি-মতাদর্শের বাহকদের যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অপরাধে ন্যুরেমবার্গ বিচারের পুনরায় এই ‘জ্যান্ত’ হয়ে ওঠা, বাংলা নাট্যমঞ্চের ক্রমবর্ধমান ছদ্ম-অরাজনৈতিকতার পরম্পরাতে ভাঙন ধরায়। এই নাটকের মূল চরিত্র, একজন নাৎসি আমলের বিচারক যিনি ন্যুরেমবার্গ বিচারের অন্তর্গত একজন গণহত্যাকারী, যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন দেবশঙ্কর হালদার। তার পক্ষাবলম্বী উকিলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বর্ষীয়ান সুপ্রিয় দত্ত। নাটকটির শুরুতে প্রাক্তন বিচারপতিকে, যুদ্ধে জয়ী মার্কিনপক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে আসা উকিলের মুখে জার্মানির ঐতিহাসিক বঞ্চনা, যুদ্ধের দায় জার্মানদের ঘাড়ে চাপানোর ‘অপরাধে’র কথা শুনতে শুনতে, তার ক্রুদ্ধ হওয়ার ভঙ্গিটি দেখতে দেখতে ক্লান্ত বিচারক বলেন- ‘আপনিও তো যেতেন হিটলারের সভায়?’। অর্থাৎ, হেরে গিয়েও, মরে গিয়েও আপনার শরীরী বিভঙ্গে হিটলার বেঁচে রয়েছেন। ফ্যাসিবাদ এই বায়োপলিটিক্সেরই জন্ম দিতে চায়, যখন জনসমষ্টি বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিটলারে পরিণত হয়। বর্তমানে জার্মানির বুকে নয়া-নাৎসি এএফডি পার্টির উত্থান সেই সত্যকেই পুনরাভিনয় করছে।ভিক্তর ক্লেমপেরার বিরচিত, ‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দ্য থার্ড রাইখ’ পাঠ করলে টের পাওয়া যাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটির নাম ছিল ‘ডিনাজিফিকেশন’ – জার্মান ফ্যাসিবাদের রোগ নিরাময় প্রকল্প। ভিক্তর ভেবেছিলেন ‘আমি আশা করি, এবং প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করি, এই ভয়ঙ্কর শব্দটির জীবনকাল কেবল স্বল্পস্থায়ী হবে; এবং এটি একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এক সময় এর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।’ আবিশ্ব অতিদক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান দেখে মন হয়না, এই বিশ্বাস অটুট রয়েছে। ভিক্তর আরও বলেছিলেন ‘কেবল নাৎসি কর্মকাণ্ডই বিলুপ্ত করলে হবে না, বরং নাৎসি মনোভাব, চিন্তাভাবনার ‘সাধারণ’ নাৎসি পদ্ধতি এবং এর প্রজননস্থল: নাৎসিবাদের ভাষাও বিলুপ্ত করতে হবে।’ হিটলারের ‘মেইন ক্যাম্ফ’ বইটিতে যখনই শিক্ষার সাধারণ নীতিগুলি উত্থাপিত হয়, তখনই দেখা যায় ‘শারীরিক দিক’টি সর্বদা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি (হিটলার) ‘körperliche Ertüchtigung ‘(শারীরিক প্রশিক্ষণ)’ অভিব্যক্তিটি খুবই ভালোবাসতেন, যা তিনি ওয়েমার রক্ষণশীলদের অভিধান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি জাতির ‘ক্ষয়িষ্ণু দেহে’একমাত্র সুস্থ ও জীবনদায়ী ঔষধি হিসেবে উইলহেলমাইন সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন, এবং সামরিক পরিষেবাকে তিনি সর্বোচ্চ শারীরিক সম্ভাবনা অর্জনের প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হিসাবে দেখান। হিটলারের মতে, ‘চরিত্রের বিকাশ’ স্পষ্টতই দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে; তার দৃষ্টিতে এটি কমবেশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকশিত হয়, তাই ‘শারীরিক’ শিক্ষার আধিপত্য বিস্তার করতে হবে এবং নাগরিকের ‘মনের কাজ’কে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। ‘শারীরিকতা’র প্রতি এই অত্যাধিক অভিনিবেশই, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক বিকাশের অন্যতম লক্ষণ। ভবিষ্যতে আলোচ্য নাটকটি যারা দেখবেন, তারা নাটকটিতে দৃশ্যায়িত বলপূর্বক নিবীর্যকরণের দৃশ্যটি এই ফ্যাসিবাদী ‘দেহতত্ত্বে’র আলোকে দেখলে ফ্যাসিবাদের দেহ-দখলের রাজনীতি বুঝতে কিঞ্চিত সুবিধা হতে পারে। এই একই গ্রন্থে ভিক্তর বলছেন, যে শাসনকালে ‘সিস্টেম (তন্ত্র)কে ভ্রুকুটি দেখানো হয়, তাহলে সেই নাৎসি-সময়কালের ‘সরকারী আমলা-পুলিশ-বিচারে’র তন্ত্রকে কীভাবে বোঝা যাবে? কিন্তু তাদেরও নিজস্ব একটি ‘সিস্টেম’ (কাঠামো) ছিল, এবং তারা এই সত্য নিয়ে গর্বিত ছিল যে জীবনের প্রতিটি অভিব্যক্তি এবং পরিস্থিতি ওই নাৎসি-নেটওয়ার্কের (তন্ত্রের) মধ্যে আটকে আছে। আসলে তাদের (নাৎসিদের) কোনও গঠনতন্ত্র ছিল না, তাদের আদপে ছিল একটি ও একটিমাত্র মতাদর্শিক সংগঠন, যারা যুক্তির শক্তি দিয়ে পদ্ধতিগতভাবে চিন্তা করে না, যারা সমস্ত তন্ত্রের ভেতরে ‘গোপনীয়তা’ আরোপ করে, সমস্ত তন্ত্রকে একীভূত করে নিজেদের গণহত্যার পাপকে উদযাপনে বাধ্য করে। এইটিই আদপে ফ্যাসিবাদ, আপাত ‘গণতন্ত্রে’র মূলাধার, অর্থাৎ যেখানে সকল প্রশাসনিক-তন্ত্র, আইনকাঠামো সদিচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় একটি মতাদর্শিক অবতলে নেমে আসতে বাধ্য হয়। এই বাধ্য হয়ে গণহত্যার ‘দায়’ বইবার মানসিক দোলাচল, নাটকটির একাধিক দৃশ্যে বিচারাধীন দেবশঙ্কর হালদারের চরিত্র ও মার্কিনপক্ষের বিচারক (বিশ্বজিত চক্রবর্তী)র একাধিক যৌথ দৃশ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ, একজনের দায় যদি হয় হলোকস্টের, অপরজনের দায় হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক হামলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ট্রাইব্যুনালগুলিতে স্পষ্টতই থার্ড রাইখে হিমলার এবং এসএস- ঝটিকা বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কিত প্রধান যুক্তিগুলি গৃহীত হয়েছিল। বিচারক মাইকেল এ. মুসমান্নো একটি সংগঠন হিসেবে এসএস এবং এর সদস্যদের ‘হিটলারের প্রতি সম্পূর্ণ দাসত্বপূর্ণ আনুগত্য’ সম্পর্কে রায় দিয়েছিলেন। তার মতে, এমনকি এসএস সদস্যদের চিন্তাভাবনাও হিটলারের সাথে ‘শৃঙ্খলিত’ ছিল—এই বিচারকের অধীনে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ছিল ‘নাৎসি মতাদর্শের সম্মোহনের অধীনে, জার্মান জনগণ এই অদ্ভুত এবং অমানবিক ব্যবস্থার প্রতি সহজেই অনুনয়শীল হয়ে পড়েছিল।’মুসমানোর নেওয়া আইনি পাঠে, হিমলার, যাকে তিনি এসএসের ‘সুপার-ইগো’ হিসেবে দেখেছিলেন, সে পরবর্তীতে সাইকোপ্যাথ প্রমাণিত হয়। এবং, রায় বেরোয়, ‘হিমলার একজন অধঃপতিত মনোরোগী ছিলেন তা এখন সমস্ত জার্মান জনগণের কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত।’ যদিও হিমলারকে ‘শয়তানের পুনর্জন্ম’ (বাইবেলীয় অর্থে) হিসাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত করানোকে, অনেক ঐতিহাসিক বিজয়ী দেশগুলির বিজিত জার্মান নাগরিকদের কৌমগত মনোবল ভেঙে দেওয়ার কৌশল বলে মনে করেছেন। নাট্যপ্রযোজনাটির অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্রাভিনেতা, বুদ্ধদেব দাস, যিনি মার্কিনপক্ষীয় উকিলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার সংলাপে এসএস (ঝটিকাবাহিনী) ও আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের) উল্লেখ নেহাত কাকতালীয় নয়, বরং ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্ঘের যে ধরণের সামাজিক অপরায়ণের হিংসাত্মক রাজনৈতিক ‘ঐতিহ্য’ তাতে ভবিষ্যতে তাকেও কোনো ন্যুরেমবার্গের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। নুরেমবার্গের বিচার হল সেই প্রথম আদালত কার্যক্রমের মধ্যে একটি, যেখানে ফিল্ম-ফুটেজকে অপরাধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালের (IMT)সামনে প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়, শুধুমাত্র প্রসিকিউটররাই ছবি দেখানোর ক্ষমতা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। নুরেমবার্গ সামরিক ট্রাইব্যুনালের (NMT) সামনে বিচারের সময়, কিছু প্রতিরক্ষা আইনজীবী তাদের মক্কেলদের পক্ষে পাল্টা ছবি প্রকাশের চেষ্টা করার জন্য এই নতুন দৃশ্যমাধ্যমটিকে ব্যবহার করেছিলেন। তবে প্রদর্শিত কোনও ছবিই রায়ের জন্য নির্ণায়ক প্রমাণিত হয়নি, কারণ তারা প্রমাণ করতে পারেনি আসামীরা যে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত, সেগুলি তারাই করেছে বা তারাই করেনি। তবে, যদিও নুরেমবার্গের আইনজীবীরা অবশ্যই তাদের হাতে থাকা চলচ্চিত্রগুলির আইনি দুর্বলতা সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত ছিলেন। এবং, প্রকৃতপক্ষে, আদালত কক্ষে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলি, বিশেষ করে তথাকথিত নৃশংসতার চলচ্চিত্রগুলি, অন্তত আইএমটি বিচারের সময়, যথেষ্ট জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সাংবাদিক উলরিক ওয়েকেল তার প্রতিবেদনে মর্মান্তিক ছবি এবং আসামীদের উপর তাদের অনুমিত প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, পরে বেশ কয়েকজন স্মৃতিকথাকার আদালতে নৃশংসতার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। নুরেমবার্গ বিচারের উপর নির্মিত তথ্যচিত্রে এবং কাল্পনিক ফিচার ফিল্মে উভয় মাধ্যমেই আদালতে নৃশংসতার চলচ্চিত্র প্রদর্শন অংশটি এখনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে। ১৯৫৮ সালের CBS সিরিজ টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরির একটি পর্ব, ২০০০ সালের TNT মিনি সিরিজ ‘নুরেমবার্গ’ এবং ১৯৬১ সালের সুপরিচিত ফিচার ফিল্ম জাজমেন্ট অ্যাট নুরেমবার্গ এগুলির মধ্যে প্রখ্যাত। ন্যুরেমবার্গ বিচার সম্পর্কে এই চলচ্চিত্রগুলি ঐতিহাসিকদের জন্য প্রাথমিক উৎস, যদিও নয়। কারণ, উল্লিখিত শিল্পকর্মগুলি সত্যনিষ্ঠভাবে ঐতিহাসিক বাস্তবতার উৎপাদন থেকে দূরে সরে গিয়েছে। আলোচ্য নাটকটির ক্ষেত্রে যদিও তেমন কিছু ঘটেনি, ঘটমান বর্তমান ও স্থবির অতীতের মাঝামাঝির একটি স্পেসিও-টেম্পোরাল পরিসর এখানে নির্মাণ করা হয়েছে। আর্কাইভাল ফুটেজ, বিভিন্ন সমসাময়িক আন্দোলনের পোস্টার, ব্যানার, সঙ্গীতের ব্যবহার সমন্বিত মিক্সড-মিডিয়া প্রতিবেশ তৈরী করার কৃতিত্ব একান্তই সোমদত্তা ঘোষ, সুহাসিনী দত্ত, আয়ুষ্মান হালদার, মৃণাল বাউর, সৃজিতা দত্ত ও অন্যান্যদের যারা এই প্রযোজনাটির মঞ্চায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রতন কুমার দাস কৃত অনুবাদে, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশিত, আলব্যের কামুর ‘ক্যালিগুলা’ প্রাচ্যের আরেকটি ‘সমকালীন’ প্রযোজনা। প্রযোজনাটিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন গৌতম হালদার। ক্যামুর ক্যালিগুলা নাটকটি, অস্তিত্ববাদী দর্শনের দ্যোতক, নাকি অ্যাবসার্ড থিয়েটারের একক প্রতিনিধি হিসেবে তার অবস্থান,এ আলোচনা আজ বাহ্যত কোনো অর্থই বহন করেনা। এখানে সার্ত্রের বিশ্বাসের প্রতি, ক্যামুর দ্ব্যর্থহীন উত্তর রয়েছে যে, ‘সমস্ত স্বাধীনতা অপরিহার্যভাবে সমান’। ক্যালিগুলা চাঁদকে দখল করার, মৃত্যুকে বিলোপ করার এবং পশ্চিমে সূর্য উদিত করার নিরর্থক প্রচেষ্টায় এ কথাই বারবার বলেছে। স্কিপিওর বোধগম্যতা, অন্তর্দৃষ্টি এবং আনুগত্য ব্যতীত,তার পিতৃহন্তা ক্যালিগুলার ‘উন্মাদ’ সত্তা বলে উঠতে পারে না, সবকিছু সম্ভব এবং মানুষই ঈশ্বর। তাকে হত্যা করা হয় কারণ তিনি মানুষ এবং তাদের সবচেয়ে পবিত্র জিনিসগুলিকে উপহাস, অবমাননা এবং অপমান করেছিলেন: প্রেম, বন্ধুত্ব এবং সুখকে খিল্লি করেছিলেন। পরিবার, সমাজ, মানবিক সম্পর্ক নামক সামাজিক সংগঠনগুলির জন্য সে হয়ে উঠেছিল হুমকির মত। ক্যালিগুলা বিশ্বাস করে, জীবিত ‘পুরুষ’রা সুখী হতে পারে না। সে নিজেকে দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করে এবং অন্যদের ধ্বংস করে নিজেকে স্বাধীন প্রমাণ করার জন্য। The Possessed-এ দার্শনিক কিরিলভ আত্মহত্যা করেছিলেন প্রমাণ করার জন্য যে তিনি স্বাধীন ছিলেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। সার্ত্রের Orestes ‘Les Mouches’-এ প্রধান চরিত্র তার মা এবং তার সৎ পিতাকে হত্যা করে, এটা প্রমাণ করার জন্য যে সেও স্বাধীন এবং তাই তার কর্মের জন্য ‘সেও’ দায়ী। বিদ্রূপাত্মকভাবে, ‘Le Mythe de Sisyphe’ – তে কামু আত্মহত্যা এবং হত্যা উভয়কেই মানুষের ভয়ঙ্কর স্বাধীনতার সন্তোষজনক সমাধান হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন কারণ তারা তার বিদ্রোহ, তার স্বাধীনতা এবং তার আবেগ – জীবনের এই কারণসুধাগুলিকে অস্বীকার করে। ক্যালিগুলার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় কারণ ক্যালিগুলার কর্মকাণ্ড জীবনের আস্বাদন নয় বরং মৃত্যুর দিকে ধাবমানতা। ক্যালিগুলা ‘অ্যাবসার্ডে’র মূর্ত রূপ, সে নিজেই মঞ্চ, নিজেই সমগ্র নাট্যশালা। নাটকটির প্রতিটি দৃশ্য দর্শকদের অনিবার্যভাবে যে কথাটি বলে যায়, তা হল, যদিও পৃথিবী অযৌক্তিক, তবুও ‘স্বাধীন’ মৃত্যুর পরিবর্তে জীবনকে, উদাসীনতার পরিবর্তে মানব সংহতিকে, নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে প্রেমকে বেছে নিতে হবে। এই সমগ্র পারফর্মেন্স স্পেকটাকলটিকে সশরীরে, মধুর নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ধারণ করেছেন গৌতম হালদার। তিনি যে বিগত দুটি প্রজন্মে জন্মানো সবচেয়ে বড় বাঙালি মঞ্চাভিনেতা, তা শুধুমাত্র ‘ক্যালিগুলা’ দেখে কেউ বললেও অত্যুক্তি হবেনা। প্রযোজনাটির শেষে একটাই চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই সুযোগে লিপিবদ্ধ করে রাখা যাক। এই মুহুর্তে রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাববিশ্বে ‘পপুলিজম’ একটি বিতর্কিত ধারণা, বিশেষত অতিদক্ষিণপন্থার সাম্প্রতিক উত্থান বিচারের ক্ষেত্রে। এই শাস্ত্রের পণ্ডিতরা বিপুল, বিতর্ক বিতন্ডা করছেন যে, এটি একটি মতাদর্শ, নাকি বক্তৃতার মোহমায়াজাল, নাকি একটি নব্য পুঁজিবাদী রাজনৈতিক কৌশল? পপুলিজমের ক্ষুদ্রতম সংজ্ঞাটি আমরা এভাবে নিরূপণ করতে পারি, যে এটি একটি মতাদর্শিক কাঠামো যা খাঁটি (পিওর) মানুষের তালাশ করছে এবং অন্যান্যদের ( দেশকালপাত্রবিশেষে অভিজাতদের এবং সে রাষ্ট্রে বহিরাগত রিফিউজি)দের প্রতি একটি দ্বিমুখীতার উপর কেন্দ্রীভূত হয়ে রয়েছে। পপুলিজম তার মূলসূত্র অনুযায়ী, বহুস্বর-বিরোধী এবং, একইসঙ্গে পুরাতন অভিজাতদেরও-বিরোধী। ডানপন্থী পপুলিজম জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদির পরিসরে দ্বিমুখীতা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে বিশেষ কোনো একটি সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীর জনগণকে ওই ‘খাঁটি’ স্থানীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয় , এবং যারা পুরাতন শাসনকাঠামোর অভিজাত, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু তাদের বিচ্ছিন্ন করা হবে। এই বিশ্বজোড়া ডান-পপুলিজমের প্রহরে, মোদী অথবা নেতানিয়াহুর সঙ্গে ‘ক্যালিগুলা’র তুলনা চলেনা। সে প্লাতোর ‘ফিলোজফার-কিং’ (দার্শনিক সম্রাট)। তার সঙ্গে বিদ্বেষী গণহত্যাকারীর তুলনা অমূলক।
