
জ্ঞানগঞ্জের পক্ষে বিশ্বেন্দু নন্দ
উপনিবেশের আগে বিশেষ করে ক্রুসেডের সময় এশিয়ার তিন বড় উৎপাদন অঞ্চল, চিন, দক্ষিণ এশিয়া, পারস্যের পণ্য পৌঁছত তুর্কির ইস্তামবুল শহর হয়ে ইওরোপের বিভিন্ন দেশে। বড় অংশ যেত স্থলপথে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ এশিয়া [যার কেন্দ্র অবিভক্ত বাংলা], আফগানিস্তান, ইরান, তুর্কি; চিনের রাস্তা ইরান হয়ে তুর্কি পৌঁছত; অন্য রাস্তা সমুদ্র রাজপথ – দক্ষিণ এশিয়ার পশ্চিম উপকূল হয়ে লোহিত সাগর হয়ে উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইওরোপ।
ইওরোপ যেহেতু নিজের ভোগ-দ্রব্য জন্য সেদিনও প্রায় কিছুই উৎপাদন করত না, আজও করে না, তাই তার লক্ষ্য ছিল এশিয়া থেকে ফিনিশড গুডসের সরবরাহ নিশ্চিত করা। স্থলপথ জলপথ দুটোই তার হাতছাড়া হয় ক্রুসেড শেষে ১৪৫২-৫৩য় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাজার ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ ইওরোপের হাতছাড়া হয়ে এশিয়দের নিয়ন্ত্রণে আসায়। তারপরেই শুরু হল পশ্চিম ইওরোপের আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দক্ষিণ এশিয়ায় আসার উদ্যম এবং আলেকজান্ডারের সময় থেকে ২৫০০ বছরের উপনিবেশ তৈরি ভাবনা বাস্তবায়িত করা। পলাশীর পর ২৬৮ বছরে কয়েক হাজার কোটি ট্রিলিয়ন পাউন্ড লুঠে ইওরোপ বহিরাঙ্গের চাকচিক্য বদলালেও বাস্তবে আজও পণ্য কাঁচামালের জন্য সে তাকিয়ে থাকে এশিয়া/আফ্রিকার দিকেই।

এশিয়ার বড় বাজার আজও ইওরোপ আমেরিকা। তার অর্থনীতির ভিত্তি ইওরোপ আমেরিকার বাজার। ১৯৭৮ থেকে চিন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। ২০১৩-র বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভে ইওরোপ-আমেরিকা কেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে, উপনিবেশপূর্ব সময়ে পৌঁছেছে। চিন এশিয়া-আফ্রিকাকে বিশাল কাঁচামালের সোর্স আর ফিনিশড পণ্য পৌঁছবার ইনিফিনিটি বাজার হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকায় হাতেগোণা বন্ধু, অগণিত শত্রু দেশ নিয়ে ভারতের পক্ষে ইওরোপ-আমেরিকা কেন্দ্রিক রাজনীতি/অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্ঘী সরকার যেহেতু চিনের বেল্ট রোড ইনিশিয়েটভের অংশ হতে পারবে না, এবং একই সঙ্গে সে আমেরিকার হেজিমনি ধ্বংস করতে তৈরি হওয়া ব্রিকসকেও দুর্বল করবে, তাই তাকে ইওরোপ-আমেরিকা এবং এশিয়ার নব উদিত সূর্য সৌদি পরিবারকে সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন এশিয় রাজপথ IMEC বা ইন্ডিয়া মিডল ইস্ট ইওরোপ ইকনমিক করিডোর তৈরির উদ্যম নিতে হল। পাশে দাঁড়াল সৌদি সরকার, বাইডেন সরকার আর ইইউ। দুই করিডোরের মাঘে থাকবে ইজরায়েলের হাইফা পোর্ট। লকডাউনের মধ্যেই সঙ্ঘী শিল্পপতি গৌতম আদানিকে হাইফা বন্দরের অংশিদার বানানো হল।
২০২৩এ যখন আমরা ভারতে জি২০ সম্মেলনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছি, তখনই সেপ্টেম্বরে জি২০-র মূল মঞ্চ থেকে ইন্ডিয়া-মিডলইস্ট-ইওরোপ ইকনমিক করিডোর IMEC-র ঘোষণা করলেন নরেন্দ্র মোদি, ইইউ, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব আর আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান/মন্ত্রীদের পাশে দাঁড় করিয়ে। প্রকল্পের দুটো করিডোর, ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পূর্ব করিডোর; ভূমধ্যসাগর থেকে ইওরোপ পর্যন্ত উত্তর করিডোর। প্রকল্পের সমর্থনে বাইডেন এবং নেতানইয়াহু আলাদা প্রেস কনফারেন্স করলেন।
প্রকল্পের মুখড়া হিসেবে বলা হল ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে পণ্যবাহী জাহাজ চিরাচরিত সমুদ্র রাজপথ বেয়ে সৌদি আরবে পৌঁছবে। সেখান থেকে স্থলপথে রেলপথে পণ্য জর্ডন হয়ে ভূমধ্যসাগরের ইজরায়েলের হাইফা বন্দর হয়ে বিভিন্ন ইওরোপিয় দেশে প্রবেশ করবে। ইওরোপ চাইছে লোহিত সাগর আর সুয়েজ খালের জ্যাম, রাজনৈতিক সমস্যা এড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পণ্যের নিরন্তর সাপ্লাই চেন তৈরি করা।
জি২০ সম্মেলন চলাকালীনই লিখেছিলাম, ইজরায়েলকে নিয়ে, সুয়েজ খাল এড়িয়ে এশিয় পণ্য ইওরোপে পৌঁছনোর এই প্রকল্প আদতে চিনের বেল্ট ইনিশিয়েটিভকে কাউন্টার করতে তৈরি। যদিও ভারতের বক্তব্য ২০০০-এর পর সমুদ্র বাণিজ্য বেড়েছে ২৫০%; ২০২১এর মার্চে ৪০০ মিটারের বিশাল জাহাজ আড়াআড়িভাবে সুয়েজ খালে আটকে গেলে ৬ দিন বিশ্ববাণিজ্য থমকে যায়। প্রতিদিন ক্ষতি হয় ১০ বিলিয়ন ডলার। তেলের দামও বাড়ে। এই ঝামেলা এড়াতে নতুন করিডোরের ভাবনা। এতে বিশ্ব শিপিং টাইমের ৪০% বাঁচবে, পণ্য পরিবহনে খরচ কমবে ৩০%।
কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য এই প্রকল্পের বড় সমস্যা মধ্য/পশ্চিম এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা। জি২০ সম্মেলন শেষ হতে না হতেই ইজরায়েল একতরফা গাজার আক্রমণ শুরু করল। এই করিডোর যে সব দেশের মধ্যে দিয়ে যাবে, সেখানে শুরু হল ইজরায়েল বিরোধী হিংসাত্মক আন্দোলন। শুরু থেকেই প্রকল্পের কপালে প্রশ্ন চিহ্ন লেগেগেল। হাইফা বন্দর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়াজরায়েল-আদানির মধ্যে খিটিমিটি লেগেই আছে। কূটনৈতিকদের বক্তব্য IMEC প্রকল্প ঠাণ্ডাঘরে চলে যাচ্ছে।
বিপুল মাথাব্যথা নিয়ে গত এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবে গিয়ে রাজপরিবারকে প্রকল্পে সক্রিয় হতে অনুরোধ করেন। বিদেশ মন্ত্রী বিক্রম মিশরি আমেরিকায় যান। তাঁর বক্তব্য এটি ঠাণ্ডা ঘরে যায় নি, The political and security in the regions seems like progress of IMEC has frozen, but India has engaged with selected partners and exchanged views on what needs to be done. We don’t necessarily need to wait for the security situation to completely settle down for work to start on IMEC.
এপ্রিলে বাণিজ্য মন্ত্রী পিযুষ গোয়েল নয়াদিল্লিতে IMEC High-Level Roundtable on Connectivity and Economic Growth সম্মেলনে বলেন এই প্রকল্প ভিশনারি কনসেপ্ট; নতুন যুগের নতুন রেশম পথ – It will bring down logistics costs by up to 30 per cent, reduce transportation time by 40 per cent, and create seamless trade linkages across continents. We will not only be linking trade; we will be linking civilizations and cultures — from Southeast Asia to the Gulf, from the Middle East to Central Europe.
জ্ঞানগঞ্জ মনে করে ইজরায়েলের বিপুল রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত বিরোধী অবস্থান এই প্রকল্পকে কার্যত ঠাণ্ডাঘরে ঠেলে দিয়েছে। অথচ নরেন্দ্র মোদির বহু চর্চিত মেক ইন ইন্ডিয়া আর চিন বিরোধিতার অন্যতম ভিত্তি IMEC প্রকল্প। ফলে এই প্রকল্পের সঙ্ঘের মাথা ব্যথা, এবং সঙ্ঘ প্রোমোটেড শিল্পপতি গৌতম আদানির সামনে সমস্যার পাহাড় তৈরি হওয়ার রাস্তা পরিষ্কার।

শেষ খবর মোদি-মিশরির পাশাপাশি এপ্রিলে New Paper on the Future of The India Middle East Europe Economic Corridor (IMEC) তৈরি করবেন গিডালিয়া আফটারনাম, এন জনার্দন, মহম্মদ বাহারুম ম্যাক্সিমিলিয়ান মায়ার। তাদের নিয়ে নতুন কমিটি তৈরি করা হয়েছে। মোদি-মিশরি এবং চার কনসালট্যান্ট এই প্রকল্প আদৌ ঠাণ্ডা ঘর থেকে বের করতে পারবেন কিনা সেই প্রশ্নই কূটনৈতিক জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
