দেবী জয়দুর্গা চৌধুরাণী ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রামের নেত্রী। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শিবুকুণ্ঠিরাম (বামন পাড়া বা ভুতছড়া) গ্রামের ব্রজকিশোর রায়চৌধুরী কাশিশ্বরী দেবীর মেয়ে জয়দুর্গা দেবী। বিয়েরপর জমিদারী সামলে জনগণের থেকে চৌধুরাণী উপাধি অর্জন। জলপাইগুড়ি বাসিন্দারা আজও দেবীচৌধুরাণীর শ্মশান গর্বভরে দেখান। আমার সেই শ্মশানে পা দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার মন্থনার জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার অনন্তরাম। কোচবিহার রাজার কর্মচারীর থাকা অবস্থায় তিনি মন্থনায় জমিদারী পান। ১৭১১ মোগল বাহিনী কোচবিহার আক্রমণ করলে কোচবিহারের অন্যান্য জমিদারের মত মোগলদের পক্ষে গিয়ে মোগল শাসনের আওতাধীন জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন। জমিদার অনন্তরামের পুত্র যাদবেন্দ্র নারায়ণ, তার পুত্র রাঘবেন্দ্র নারায়ণ। এরপর জমিদারী পরিচালনা করেন পুত্র নরেন্দ্র নারায়ণ। নরেন্দ্রর সঙ্গে জয়দুর্গার বিবাহ হয়। ১৭৬৫ নরেন্দ্র নারায়ণ উত্তরাধিকারহীন অবস্থায় মারা যান। স্বামীর অবর্তমানে জয়দুর্গা দেবী জমিদারীর ভার গ্রহণ করে চৌধুরাণী হন। বিধবা জয়দুর্গা প্রায় তিন দশক জমিদারী পরিচালনা করেন। সে সময় আরেক জমিদারিনী নাটোরের জমিদার রামকান্তের বিধবা রাণী ভবানীর নাম আমরা জানি। তিনিও বজ্রমুষ্ঠিতে জমিদারি চালিয়েছেন।
পলাশীর চক্রান্তে বিজয়ী হয়ে নতুন শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশ লুঠতে শুরু করে। ছয়াত্তরের গণহত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই অত্যাচারী দেবী সিংহকে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের ইজারাদার নিযুক্ত করেন কোম্পানি প্রধান হেস্টিংস। হেস্টিংসএর ডান হাত দেবী সিংহ আর তার কর্মচারী হরেরাম দিনাজপুর লুঠতে শুরু করে। ইংরেজেরা তখন রাজস্ব বাড়িয়েছিল পলাশীর সময়ের কয়েকগুণ। দেবী সিংহ চাপালেন আরও দশগুণ। দেবী সিং ১৮ রকমের আওবাব আদায় করছিলেন। রংপুরে হররাম শুরু করলেন ২১ প্রকারের আদায়। এই অতিরিক্ত অর্থ দেবার সাধ্য কৃষকদের ছিল না। যারা দিতে পারল না তাদের দেবী সিং-এর পেয়াদা দিয়ে ধরে নিয়ে এসে নির্মমভাবে অত্যাচার করল। সহায়-সম্বল সব কিছু লুটল। একের পর এক ঘরবাড়ি জ্বলল। বাঁশের টুকরো চাঁদের মত চেঁছে তার দুদিক মহিলাদের স্তনে বিঁধিয়ে দৌড় করানো হত। বহু নারী এইরকম হাজারো অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে আত্মহত্যা করেছে।
দিকে দিকে রাজস্ব বাকি পড়ল। ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায়কে রাজস্ব বকেয়া থাকায় দেবী সিংহের লেঠেল বাহিনী তুলে নিয়ে রংপুরের মীরগঞ্জে দেবী সিংহের কুঠিবাড়িতে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখে। বহু টাকা মুক্তিপণ দিয়ে শিবচন্দ্র রায় নিষ্কৃতি পান। জাগগান থেকে জানা যায়, মুক্তি পেয়ে শিবচন্দ্র মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরানীর পরামর্শে রংপুরের সব জমিদারকে রাজস্ব বোঝা আর কর আদায়ে দেবী সিংহের অত্যাচারের বিষয়ে ইটাকুমারী জমিদার বাড়িতে উপস্থিত হতে অনুরোধ করেন।
রংপুরের রংপুর ধর্মসভার সভাপতি পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন ইটাকুমারীর প্রখ্যাত লোক কবি রতিরাম দাসের জাগ গান সংগ্রহ করে রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় ‘জাগের গান’ নাম দিয়ে নিবন্ধ লেখেন। রতিরাম দাস লেখেন –
‘‘রঙ্গপুরে আছিল যতেক জমিদার
সবাকে লিখিল পত্র সেঠটে আসিবার।
নিজ এলাকার আর ভিন্ন এলাকার
সক্কল প্রজাক ডাকে রোকা দিয়া তার।
হাতি ঘোড়া বরকন্দাজে ইটাকুমারী ভরে
সব জমিদার আইসে শিবচন্দ্রের ঘরে।
পীরগাছার কর্ত্তী আইল জয়দুর্গা দেবী
জগমোহনেতে বৈসে একে এক সবি।’’
কিন্তু উপস্থিত জমিদাররা এই বিষয়ে কোন মতামত প্রকাশে অক্ষমতা প্রকাশ করায় রাজা শিবচন্দ্র রায় ক্ষুব্ধ হন। রতিরাম দাসের ভাষায় –
‘‘কারো মুখে নাই কথা হেটমুণ্ডে রয়
রাগিয়া শিবচন্দ্রে রায় পুনরায় কয়।
যেমন হারামজাদা রজপুত ডাকাইত
খেদাও সর্ব্বায় তাক ঘাড়ে দিয়া হাত।’’
কিন্তু এতেও কোন কাজ হয় না। ফলে –
‘‘জ্বলিয়া উঠিল তবে জয়দুর্গা মাই
তোমরা পুরুষ নও শকতি কি নাই ?
মাইয়া হয়া জনমিয়া ধরিয়া উহারে
খণ্ড খণ্ড কাটিবারে পারোং তলোয়ারে।
করিতে হৈবেনা আর কাহাকেও কিছু
প্রজাগুলা করিবে সব হইব না নীচু।
রাগি কয় শিবচন্দ্র থর থর কাঁপে
ফ্যাণা ধরি উঠে যেমন রাগি গোঁমা সাপে।’’
জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানীর ভৎসনায় ফল পাওয়া গেলেও মনে হয় না সব জমিদারের তরফ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। কবি রতিরাম দাস লিখেছেন –
‘‘চারি ভিতি হাতে আইল রঙ্গপুরে প্রজা
ভদ্রগুলা আইল কেবল দেখিবার মজা।’’
এই ভদ্ররাই হলেন সমকালীন ইংরেজভক্ত জমিদার। আর এই আহ্বানের ফলাফল সম্পর্কে কবি বলেছেন –
‘‘ইটায় ঢেলের চোটে ভাঙ্গিল কারো হাড়
দেবী সিং এর বাড়ী হৈল ইটার পাহাড়।
খিড়কির দুয়ার দিয়া পলাইল দেবী সিং
সাথে সাথে পালেয়া গেল সেই বারো ঢিং।
দেবী সিং পালাইল দিয়া গাও ঢাকা
কেউ বলে মুর্শিদাবাদ কেউ বলে ঢাকা।’’
দেবী সিংহ সেই যাত্রায় কবির বর্ণনা মতোই পালিয়ে মুর্শিদাবাদের নশীপূরে চলে গেলেও এইভাবে সূত্রপাত হল ঐতিহাসিক রংপুর বিদ্রোহের। ফতেপুর চাকলার অগ্নিগর্ভ এ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে গোটা রংপুর ও দিনাজপুরের গ্রামে গ্রামে।
এসময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রংপুর কালেক্টর রিচার্ড গুডলাড ও সেনা কমান্ডার লে: ব্রেনান অনেকটাই বেসামাল হয়ে পড়ে। ১৭৮৩ সালের বৈশাখ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার লে: ব্রেনান বিপুল সংখ্যক সেনা নিয়ে পীরগাছার অদূরে দেবী চৌধুরানীর বাহিনীর উপরে হামলা চালায়। জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী ও শিবচন্দ্র রায়ের অনুগামী বিদ্রোহী প্রজারা ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই চালান। সম্মুখ সমরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে দেবী চৌধুরানী, শিবচন্দ্র রায়, দেবী চৌধুরানীর ছোট ভাই কেষ্ট কিশোর চৌধুরী শহীদ হন। অনেক বিদ্রোহী শহীদ হন। বেঁচে যাওয়া অল্প সংখ্যক মানুষ স্বাধীনতা এই বীর যোদ্ধাদের মরদেহ আলাইকুড়ি নদী বেষ্টিত জঙ্গলে সমাহিত করেন। ওই জঙ্গলের ‘পবিত্র ঝাড়’। অনুরূপ, ইংরেজ বাহিনীর সাথে সামনাসামনি লড়াই করে যে জায়গায় দেবী চৌধুরানী নিহত হন সেই স্থানের নামকরণ করা হয় ‘নাপাই চণ্ডী’।
কিন্তু গবেষকেরা বলছেন ১৭৯১ খ্রিঃ ১৯ অক্টোবর রংপুর জেলার বাতিল করা জমিদার তালিকায় জয়দুর্গা দেবীর নাম আছে। ডঃ মণিরুজামান রংপুরের ইতিহাসএ লিখছেন, ‘মনে হয় ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আগুন প্রশমিত হলে ১৭৯০ খ্রিঃ আগে আগেই তিনি নিরুদ্দেশ জীবন কাটিয়ে নিজ জমিদারিতে পূর্ণ মর্যাদায় ফেরত আসেন। এ কারণেই বাতিলকৃত জমিদারের তালিকায় তার নাম প্রকাশ হয়েছিল’।
অন্যদিকে ১১৭৬ বঙ্গাব্দ (১৭৬৯-৭০) থেকে ১১৯৭ বঙ্গাব্দ (১৭৯০-৯১) পর্যন্ত সময়ে তিনি মন্থনার জমিদার ছিলেন। তার দেওয়া দুটো সনদ পাওয়া গেছে। উক্ত সনদের একখানি পীরপাল (১১৭৬ বঙ্গাব্দের ৫ই মাঘ) এবং অপরটি মুশকালী চুকানী পাট্টা (১১৯৭ বঙ্গাব্দ, ২৫ কার্তিক) উপরি উক্ত পাট্টা দু খানিতে তার জমিদারি শুরু ও শেষ জানা যায় না। তবে তিনি ১৭৯০-৯১ পর্যন্ত জমিদার ছিলেন এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তাঁর মৃত্যুর পরে দত্তক পুত্র রাজেন্দ্র নারায়ণ জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। ১৮০৮-০৯ সালে হ্যামিল্টন বুকাননের রংপুর সফরের সময় তিনি মন্থনার জমিদার ছিলেন।
প্রশ্ন থাকল জয়দুর্গা দেবী চৌধুরাণীর মৃত্যু তারিখ নিয়ে।
সূত্র
পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামেপলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ – হায়দার আলী চৌধুরীর পাদপীঠ – হায়দার আলী চৌধুরী
রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ৩য় ভাগ (১৯০৯ সাল)
ফকির মজনু শাহ – মুহাম্মদ আবু তালিব
Historical Presence of Debi Chowdhurani : Gautam Kumar Das
রংপুরের ইতিহাস – ডঃ মুহাম্মদ মণিরুজামান
